ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) বলেছে, দেশের গণতন্ত্র এখন এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে দেশটি গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে পারবে; আর যদি না হয়, তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হতে পারে।
আইআরআই ২০–২৪ অক্টোবর পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মিশন পরিচালনা করে এবং নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে বৈঠক করে এই মূল্যায়ন প্রস্তুত করেছে।
সংস্কারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস জুলাই মাসে যে ‘ন্যাশনাল চার্টার’ বা জাতীয় সনদ ঘোষণা করেছিলেন, সেটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সবচেয়ে বড় নকশা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এতে ৮৪টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে—সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এবং প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদসীমা নির্ধারণ পর্যন্ত।
তবে আইআরআই বলেছে, এই সনদের বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন, সময়সীমা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং বাস্তব প্রয়োগের অস্পষ্টতা সংস্কার প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিএনপি বলছে, নির্বাচনের আগে নয়—নির্বাচনের পর এই সনদ বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। অন্যদিকে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলো নির্বাচন আগে গণভোটের দাবি তুলেছে, যাতে সনদটি পরবর্তী সংসদের ওপর বাধ্যতামূলক হয়।
নতুন প্রজন্মের কিছু দল, যেমন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), দুই নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে—সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন। তারা চাইছে, সনদটি যেন ‘বাংলাদেশ সংবিধান ২০২৬’ নামে কার্যকর হয় এবং সব জনপ্রতিনিধি তার অধীনে শপথ নেন।
আইআরআই মন্তব্য করেছে—এইসব বিতর্ক ও বিলম্ব “সংস্কার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলছে।”
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি) ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। মৃত ভোটার বাদ দিয়ে এবং নতুন ভোটার যুক্ত করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে; প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কমিশন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বাতিল করেছে জনমতের ভিত্তিতে এবং আগামী ফেব্রুয়ারির আগেই ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।
তবে আইআরআই মনে করছে, প্রবাসী ভোটের স্বচ্ছতা, প্রচার ব্যয়ের নজরদারি ও স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এখনো প্রশ্নের মুখে। এছাড়া, মাঠপর্যায়ে সামরিক বাহিনীকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে কিছু উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
আইআরআই বলেছে, “বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গতবারের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত ও স্বচ্ছ হলেও, আইনি ও প্রশাসনিক ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকিতে পড়বে।”
অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই মূল চাবিকাঠি
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিয়েছে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হলে ভোটের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব উভয়ই সংকুচিত হবে। কারণ দেশের রাজনীতির মূলধারায় আওয়ামী লীগের মতো সংগঠনকে বাদ দিলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আইআরআই বলেছে, “বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে হতে হবে। অন্যথায়, জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার অসম্ভব।”
নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ
আইআরআই নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। এখনো পর্যন্ত নারী প্রার্থীর সংখ্যা সীমিত, এবং অনেকে নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারছেন না। সংস্থাটি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন নারী নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ ও কাঠামোগত সহায়তা প্রদান করে।
এছাড়া, দেশের প্রায় চার কোটি নতুন ভোটার যেন সঠিকভাবে ভোটদানের সুযোগ পান, সে বিষয়ে বিশেষ প্রচারণা চালানোরও পরামর্শ দিয়েছে আইআরআই।
তথ্য বিকৃতি ও নির্বাচনী নিরাপত্তা
প্রতিবেদনটি বলছে, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এখন নির্বাচনী নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য নির্বাচন কমিশন ‘সংকট মোকাবিলা ইউনিট’ গঠন করেছে, যাতে অনলাইন বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
আইআরআই বলছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। “নির্বাচনের সময় সাংবাদিক সুরক্ষা আইন পাস হলে তা আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।”
একটি বাস্তবসম্মত বার্তা
আইআরআই’র বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ওপর নির্ভর করছে। সংস্কার ও গণতন্ত্র একে অপরের বিকল্প নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবেদন মূলত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি একটি সতর্কবার্তা।
দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে এবং সব রাজনৈতিক শক্তিকে সমান সুযোগ দিতে পারে—তার ওপর।

