মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার বিতর্কিত ভারতীয় ইসলামি বক্তা জাকির নায়েকের মাসব্যাপী সফরের অনুমতি বাতিল করেছে বলে জানা গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই তাঁর নভেম্বরের শেষ দিকে বাংলাদেশে আগমন অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল—যা এখন বড় ধরনের কৌশলগত পালাবদল বলে মনে করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও জনসমাগমের আশঙ্কা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে জাকির নায়েকের সফর দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, তাঁর উপস্থিতিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হতে পারেন, যা নির্বাচনের আগে পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা বলেন, “জাকির নায়েকের সফরের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হতো, যা নির্বাচনের আগে বাস্তবসম্মত নয়। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে—নির্বাচনের পরই কেবল তাঁর সফর পুনর্বিবেচনা করা যাবে।”
প্রথম সফরেই বিতর্ক
জাকির নায়েকের এটি হতো তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আগের সরকার ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি হামলার পর তাঁকে নিষিদ্ধ করে এবং তাঁর পরিচালিত ‘পিস টিভি’ চ্যানেলও বন্ধ করে দেয়।
সে হামলায় ২২ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারীদের একজন জাকির নায়েকের ইউটিউব বক্তৃতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরপরই নায়েক ভারত ছাড়েন এবং মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি আজও অবস্থান করছেন।
ভারত সরকার তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে প্ররোচনা ও অর্থপাচারের অভিযোগ এনেছে এবং মালয়েশিয়ার কাছে তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে, যদিও এখনো তা কার্যকর হয়নি।
পাকিস্তান সফরের পর থেকেই নজরে
গত বছর জাকির নায়েকের পাকিস্তান সফর নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সেখানে তাঁকে “রাষ্ট্রীয় অতিথি” মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল—যা সাধারণত কেবল উচ্চপদস্থ বিদেশি কূটনীতিক বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। সফরকালে তিনি লস্কর-ই-তইবা (LeT)–এর সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন বলে জানা যায়।
এই সফরের পর বাংলাদেশে তাঁর সফর অনুমোদনের খবর ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো তখন জানায়, বাংলাদেশ এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে “চরম উগ্রবাদী আদর্শকে বৈধতা” দিতে পারে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সফর বাতিল
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, নির্বাচন আগামী মার্চের দিকে অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশ এখন ভোটকেন্দ্র, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং বিরোধী দলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাকির নায়েকের সফর বাতিলের মাধ্যমে সরকার একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়—যে তারা নির্বাচনের আগে কোনো বিতর্কিত বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় না।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “নায়েকের মতো ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ দেওয়া ছিল সরকারের পক্ষ থেকে ইসলামপন্থী ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা, কিন্তু তা বাস্তবে নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত তারা বাস্তবতার সামনে নত হয়েছেন।”
নীতির দোলাচল ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
জাকির নায়েক ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য শুধু ধর্মীয় নয়, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সংবেদনশীল। তাঁর সফর বাতিলের সিদ্ধান্তে ভারত স্বস্তি পেলেও, ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এতে অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে।
বাংলাদেশের মধ্যপন্থী বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান দেখানো এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতে সফর পুনর্বিবেচনা?
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি অনুকূলে এলে জাকির নায়েকের সফর পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে রাজনৈতিক মহলে অনেকে মনে করছেন, এই সফর হয়তো আর কখনো বাস্তবে রূপ নেবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

