বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনে ৩ নভেম্বর এমন এক দিন, যেদিনের কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা আর অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের আর্তনাদ ডুকরে ওঠে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের চার স্থপতিকে—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এই চার নেতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নিকটতম সহচর; ছিলেন সেই রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক, যা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল।
তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল বন্দিদশায়, নিরস্ত্র অবস্থায়, রাতের আঁধারে। তাঁদের অপরাধ একটাই—বঙ্গবন্ধুর প্রতি অটল আনুগত্য এবং খন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতক সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। এ ছিল একটি জাতির আত্মাকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা, যেন বাংলাদেশ আর কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়াতে না পারে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বর্তমানের নীরবতা
প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই ষড়যন্ত্রের ছায়া আবারও ফিরে এসেছে অন্য রূপে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছে সেনা ও ইসলামী উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর সহায়তায় গঠিত মুহাম্মদ ইউনুসের তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার। এই অবৈধ প্রশাসন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, ইতিহাসেরও মালিকানা নিতে চায়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এখন আর উচ্চারিত হয় না জেলহত্যা দিবসের নাম। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল বা কামারুজ্জামানের ছবি টেলিভিশন থেকে মুছে গেছে। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়ছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের ভয়াল অধ্যায়গুলো। এমনকি যারা ঘরে ঘরে শোক পালন করেন, তারাও প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে থাকেন।
এই নীরবতাই প্রমাণ করে—দখলদার সরকার ইতিহাসকে ভয় পায়। কারণ ইতিহাস জানে কে বীর, কে বিশ্বাসঘাতক; ইতিহাস জানে কারা স্বাধীনতার পক্ষে, কারা পাকিস্তানি আদর্শের পুনরুত্থান ঘটাতে চায়।
চার নেতার উত্তরাধিকার
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু বন্দী অবস্থায় থাকায় তিনি দায়িত্ব নেন রাষ্ট্রপতির, তাজউদ্দীন আহমদ নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তাঁদের দূরদর্শিতা আর নেতৃত্বেই মুজিবনগর সরকার গড়ে তোলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সেতুবন্ধন, যা স্বাধীনতার পক্ষে বৈশ্বিক জনমত সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান ছিলেন মুক্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠক। তাঁরা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে ও প্রশাসনিক সমন্বয়ে রাখেন অসাধারণ ভূমিকা। এই চার নেতাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। তাঁদের হত্যার মধ্য দিয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।
দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি ও ষড়যন্ত্রের পুনর্জন্ম
বঙ্গবন্ধু হত্যার মতোই জেলহত্যার বিচারও দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরে সেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে, যার পরিণতিতে ২০০৪ সালে রায় ঘোষণা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত বহু আসামি আজও পলাতক। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরেই তখনও সক্রিয় ছিল সেই গোষ্ঠী, যারা ’৭৫-এর ষড়যন্ত্রের উত্তরাধিকার বহন করছিল।
আজকের ইউনুস প্রশাসন সেই একই ধারার সম্প্রসারণ। গণতন্ত্রের নামে সেনাশক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদের হাতে রাষ্ট্র তুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলা যায়। আন্তর্জাতিক মহলে সংস্কারের বুলি আওড়ালেও ভেতরে চলছে স্বাধীনতার ইতিহাস ধ্বংসের প্রকল্প।
জনতার প্রতিরোধ ও ইতিহাসের দায়িত্ব
তবুও ইতিহাসের সত্য মুছে ফেলা যায় না। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছেন, তাঁরা জানেন—বাংলাদেশের আত্মা অদম্য। ৩ নভেম্বর কেবল শোকের দিন নয়; এটি প্রতিরোধের প্রতীক। যতবার কোনো অবৈধ শাসক ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করবে, ততবার এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেবে—স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত দেশপ্রেম।
আজ জেলহত্যা দিবসের শিক্ষা হলো: রাষ্ট্রদখলকারীরা সাময়িকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে, কিন্তু তারা ইতিহাসের রায় থেকে পালাতে পারে না। সত্য, ন্যায়বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একদিন তাদের পরাজিত করবে—যেভাবে ১৯৭১ সালে অন্যায় ও নির্যাতনকে পরাজিত করেছিল এই জাতি।
বাংলাদেশের মানুষ আজও জানে, শহীদ চার নেতা বেঁচে আছেন তাঁদের আদর্শে, তাঁদের ত্যাগে, এবং সেই অঙ্গীকারে—যে দেশের ইতিহাস কখনও দখলদার শক্তির হাতে বিক্রি হবে না।

