নির্বাচনের আগেই গভীর রাজনৈতিক সংকট: আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র টিকবে না

—◊ সংবাদ ভাষ্য ◊—

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই নির্বাচন আদৌ কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে দমন-পীড়ন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এতে শুধু গণতান্ত্রিক পরিবেশই সংকুচিত হয়নি, বরং আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের অবস্থাও মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটেছে।

দিল্লিতে নির্বাসিত অবস্থায় রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন বৈধ হতে পারে না। কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা।”

একতরফা নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-আন্দোলনের পর সেনা ও কট্টোর মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমর্থনে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের উপর নজিরবিহীন দমননীতি শুরু করা হয়।

২০২৫ সালের ১২ মে, সরকার নতুন সন্ত্রাসবিরোধী আইন (Anti-Terrorism Act, ATA) সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর “অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা” জারি করে এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখন একতরফা ও প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সরকারপন্থী মহল ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন। দেশে বিরোধী রাজনীতি প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

শেখ হাসিনার ভাষায়, “নির্বাচন হতে পারে, কিন্তু তা যদি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া হয়, তাহলে সেটি কেবল এক প্রদর্শনী হবে, গণতন্ত্র নয়।”

মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চরম সংকটে

মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) জানিয়েছে, ইউনুস প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে ৪৪ হাজারেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও চাপ বাড়ানো হয়েছে। অনেককে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার্যত বিলুপ্ত—সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি, সরকারবিরোধী মন্তব্যে গ্রেপ্তার—সবকিছুই এখন স্বাভাবিক দৃশ্য।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর হামলা ও সংখ্যালঘুদের দুর্ভোগ

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চলেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বাহিনী নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রায় ১,০০০ জন আওয়ামী লীগ কর্মী, সংখ্যালঘু ও পুলিশ সদস্য নিহত;
  • শেখ হাসিনার সরকার পতনের উদ্দেশ্যে সহিংস আন্দোলনে ৩,২৪০ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে। হামলা করা হয়েছিল প্রায় ৫০০ থানায়;
  • সরকার পরিবর্তনের পর হাজার হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে;
  • সরকারের দমননীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় লক্ষাধিক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন।

শুধু ঢাকায় গত নয় মাসে ৪৯২টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে—যা গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মর্গের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৪৬৮টি অজ্ঞাত লাশ দাফন করা হয়েছে। অধিকাংশের শরীরে সহিংসতার চিহ্ন ছিল।

একই সময়ে দেশের নদ-নদী থেকে ৩০১টি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে—যার অনেকগুলোর হাত-পা বাঁধা, গলায় দড়ি বা ওজন বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফরেনসিক কর্মকর্তারা বলছেন, এসব সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।

শেখ হাসিনার বার্তা—“কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না”

দিল্লিতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ১২ কোটি ৬০ লাখের বেশি ভোটার। এর মধ্যে কোটি কোটি মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের বাদ দিয়ে কোনো সরকার গঠন করা মানে জনগণের ম্যান্ডেট অস্বীকার করা।”

হাসিনা আরও বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে দায় নিচ্ছি না, কিন্তু আমাকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। এই বিচার, অভিযোগ—সবই সাজানো নাটক। এটি গণতন্ত্র ধ্বংসের এক পরিকল্পিত প্রক্রিয়া।”

তার মূল বক্তব্য এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক—“Millions cannot be disenfranchised.”
সর্বত্র অনুরণিত হচ্ছে শেখ হাসিনার সতর্কবার্তা: “কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।”

আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার পতন

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২,৬১৬টি খুনের মামলা হয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। আগস্ট মাসে এক মাসেই ৩৮টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, যেখানে ২৩ জন নিহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ড. উমর ফারুক বলেন, “অজ্ঞাত লাশ বাড়ার অর্থ রাষ্ট্র তার বিচারব্যবস্থা হারাচ্ছে। যখন খুনিরা জানে কেউ খোঁজ নেবে না, তখন অপরাধের শাস্তি থাকে না।”

জাতিসংঘের পক্ষপাতের অভিযোগ

কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাটিক গভর্নেন্স (GCDG) জানিয়েছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল এবং সেটি ইউনুস সরকারের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, জাতিসংঘের রিপোর্টে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে, অথচ আওয়ামী লীগবিরোধী সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও প্রশাসনিক দমননীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে।

জাতিসংঘের ওই রিপোর্ট আদালতে “ঐতিহাসিক দলিল” হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—যা সমালোচকদের মতে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নষ্ট করছে।

অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি—দুই দিকেই ধস

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনুস সরকারের দমননীতি ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ থেকে নেমে ৩.৩ শতাংশে এসেছে।

২৬৮টি শিল্পকারখানা বন্ধ, রপ্তানি খাতে বিনিয়োগ ২১ শতাংশ কমেছে, বৈদেশিক রিজার্ভ টানা চার মাস ধরে হ্রাস পাচ্ছে, এবং ৩৯ মিলিয়ন মানুষ দিনে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতে পারছেন না।

বিদ্যুৎ সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনীতি গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই আহ্বান জানিয়েছে—বাংলাদেশে যেন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব ও মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

সমাধানের পথ ও গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে এখনই চারটি পদক্ষেপ জরুরি—
১️⃣  মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল;
২️⃣  আওয়ামী লীগের নিবন্ধন পুনঃস্থাপন;
৩️⃣  মতপ্রকাশ, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা;
৪️⃣  প্রতিহিংসামূলক মামলা ও বিচার বন্ধ করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।

এই পদক্ষেপগুলো না নিলে ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে কেবল একটি পূর্বনির্ধারিত নাটক, যেখানে ভোটার থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র থাকবে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এক প্রশ্নের ওপর—জনগণ কি সত্যিই ভোট দিতে পারবে?
শেখ হাসিনার ভাষায়, “গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন জনগণ ভোট দিতে পারে। কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই ধ্বংস করা।”

spot_img