বিশ্বব্যাংকের আদালতে এস আলম গ্রুপের মামলা; ‘শত শত মিলিয়ন ডলার’ ক্ষতি দাবি

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ‘সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও হয়রানির অভিযোগ’ তুলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে গিয়েছে এস আলম গ্রুপ

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে একটি সালিশি মামলা (arbitration claim) দায়ের করেছে। অভিযোগ, সরকারের বেআইনি সম্পদ জব্দ ও হয়রানিমূলক পদক্ষেপে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে “শত শত মিলিয়ন ডলার”— অর্থাৎ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা

লন্ডনভিত্তিক আইন সংস্থা কুইন ইম্যানুয়েল আরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান (Quinn Emanuel Urquhart & Sullivan) সোমবার এই মামলা দায়ের করে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত বিশ্বব্যাংক পরিচালিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (ICSID)-এ। মামলা করা হয়েছে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ২০০৪ সালের দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি (BIT) অনুযায়ী।

এস আলম পরিবারের দাবি, তারা সিঙ্গাপুরের নাগরিক হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতায় পড়ে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পরিবারের সদস্যরা সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, এর আগে ২০২০ সালে তারা বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।

‘ইচ্ছাকৃত হয়রানি’ ও সম্পদ জব্দের অভিযোগ

মামলায় বলা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে এবং একতরফা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া “অযৌক্তিক ও মিথ্যা অভিযোগের” মাধ্যমে গণমাধ্যমে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছে— যা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির পরিমাণ “শত শত মিলিয়ন ডলার” পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এস আলম গ্রুপের আইনজীবীরা মামলায় উল্লেখ করেছেন, এই সমস্ত পদক্ষেপ ছিল একটি “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা,” যার মাধ্যমে সরকার জনপ্রিয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

সরকারের পাল্টা অভিযোগ

অন্যদিকে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তা আহসান এইচ. মনসুর, যিনি সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন, তিনি অভিযোগ করেছেন— এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার করেছেন।

তার দাবি, গ্রুপটি বিভিন্ন ব্যাংক দখল করে জাল ঋণ, অতিরিক্ত আমদানি মূল্য দেখানো ও অন্যান্য বেআইনি পদ্ধতিতে বিপুল অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করেছে। এই অর্থ ফাঁসের কারণে এস আলম নিয়ন্ত্রিত বেশ কয়েকটি ব্যাংক এখন “ঋণাত্মক অবস্থায়” রয়েছে, যেগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক পটভূমি ও দ্বন্দ্বের সূত্র

এই আইনি সংঘাত এমন সময়ে এসেছে যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের বাইরে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এক উচ্চপর্যায়ের অভিযান শুরু করেছে। ডিসেম্বর ২০২৪ সালে সরকারের প্রকাশিত এক অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে (white paper) দাবি করা হয়, গত ১৫ বছরে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে দেশ থেকে পাচার হয়েছে।

এই অভিযানের অংশ হিসেবেই এস আলম গ্রুপকে অন্যতম বড় অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, “এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই এবং সরকারের পদক্ষেপ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী করণীয়

সালিশি মামলা গ্রহণের পর এখন বিষয়টি যাবে ICSID ট্রাইব্যুনালের প্রাথমিক যাচাই পর্যায়ে। এখানে নির্ধারণ করা হবে—
১. মামলাটি ওই দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় পড়ে কি না,
২. সরকারের পদক্ষেপগুলো ‘অন্যায় বা বৈষম্যমূলক’ ছিল কি না,
৩. এস আলম গ্রুপের নিজস্ব আর্থিক আচরণে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সেটি মামলার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করবে কি না।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে। যদি সালিশি আদালত এস আলম গ্রুপের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে দেশের অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠী বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও একই পথ অনুসরণ করতে পারে।

সম্ভাব্য প্রভাব

অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এই মামলার ফলাফল বাংলাদেশের আর্থিক সুনাম, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যদি রায় সরকারের বিরুদ্ধে যায়, তবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে এবং অন্যান্য দেশ থেকেও একই ধরণের দাবি উঠতে পারে।

অন্যদিকে, যদি আদালত সরকারের পক্ষে রায় দেয়, তবে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগকে বৈধতা দেবে।

এস আলম গ্রুপের এই আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা বাংলাদেশের ব্যবসা ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। একদিকে সরকার পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগকে ‘রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা’ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী শিল্পপতিরা আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন নিজেদের রক্ষায়।

ফলে এই মামলা এখন শুধু অর্থনৈতিক বা আইনি বিষয় নয়—এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের আর্থিক স্বচ্ছতা, বিনিয়োগ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীকী এক পরীক্ষা।

spot_img