ঢাকা জুড়ে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ, ড. ইউনুসের পদত্যাগ দাবি

২৫টি পয়েন্টে ছাত্রলীগ–যুবলীগের বিশাল সমাবেশ, অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অবৈধ ও ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা

রাজধানী ঢাকাজুড়ে মঙ্গলবার উত্তাল ছিল আওয়ামী লীগের বিক্ষোভে। দলটি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো একযোগে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশাল সমাবেশ ও মিছিল আয়োজন করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পদত্যাগের দাবি তোলে।

এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল—“অবৈধ ও ফ্যাসিবাদী” সরকারের পতন ঘটানো এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে জনমত সংগঠিত করা। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলীয় সভাপতির কার্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেয়ে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশে সকাল থেকেই হাজারো নেতাকর্মী মিছিল-সমাবেশে অংশ নেন।

২৫টি পয়েন্টে একযোগে মিছিল

শাহবাগ, মিরপুর-১০, ফার্মগেট, উত্তরা, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি-২৭ এবং মোহাম্মদপুরসহ ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একযোগে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচি ছিল সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় প্রদর্শন। সকালের দিক থেকেই রাজপথে “জয় বাংলা” এবং “অপ্রতিরোধ্য জয় বাংলা” স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা শহর।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগ এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগের ব্যানারে ফার্মগেট ও মতিঝিলে ছিল সবচেয়ে বড় দুটি সমাবেশ। হাজারো কর্মী একত্র হয়ে স্লোগান দেন—“অবৈধ সরকারের পতন চাই, জয় বাংলা শ্লোগানে জয় হবে প্রান্তরে।”

মতিঝিলের এক সমাবেশে এক যুবলীগ নেতা বলেন, “আজ আমরা রাজপথে নেমেছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। যারা সংবিধান ধ্বংস করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের একদিনও ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। ড. ইউনুসকে বুঝতে হবে—বাংলার মানুষ ফ্যাসিবাদী সরকারকে কখনোই মেনে নেবে না।”

আওয়ামী লীগের শক্তি প্রদর্শন

বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, সংগঠনগত সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে। আগস্টে ক্ষমতা হারানোর পর এটাই ছিল দলের সবচেয়ে বড় ও সমন্বিত কর্মসূচি। সমাবেশে বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে দলটি এখনও মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “আওয়ামী লীগ এই বিক্ষোভের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছে—তাদের সংগঠন ভেঙে পড়েনি। বরং দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা এখনও জনআন্দোলনের মূলধারায় রয়েছে।”

ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে

গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অপসারণের পর সেনা ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা হন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। শুরু থেকেই তার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক গ্রেফতার এবং বিরোধীদের দমনপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।

অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকেই কয়েক শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং হাজার হাজার আওয়ামী লীগ সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়। অনেকের বাড়িঘর তছনছ করা হয়েছে, আর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের মঙ্গলবারের সমাবেশ ছিল গণআন্দোলনের নতুন অধ্যায়। সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়—বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের সূচনা।

নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আহ্বান

বিক্ষোভকারীরা সমাবেশে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, তারা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছেন। শাহবাগের ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, “আমরা এমন একটি সরকার চাই যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে, সেনাবাহিনী বা আন্তর্জাতিক চাপে বসানো নয়।”

দিনব্যাপী মিছিল ও সমাবেশে পুলিশের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান, তবে কোনো বড় সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের এই ব্যাপক কর্মসূচি প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে, আর আওয়ামী লীগ মাঠে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে।

যেভাবেই পরিস্থিতি এগোক, মঙ্গলবারের এই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে।

spot_img