বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন অস্বীকার করায় বিতর্কে ড. ইউনুস

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও বৈষম্য নতুন নয়। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর থেকে পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে। অথচ এই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস হিন্দুদের উদ্দেশে বলেছেন—তারা যেন নিজেদের প্রথমে ‘বাংলাদেশের নাগরিক’ হিসেবে ভাবেন, ‘সংখ্যালঘু হিন্দু’ হিসেবে নয়।

‘আমরা নাগরিক, কিন্তু সমান নই’

একটি সাক্ষাৎকারে ড. ইউনুস বলেন, “আমার বার্তা হলো—আপনি যখন সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে কথা বলবেন, তখন বলবেন না, ‘আমি হিন্দু, আমাকে রক্ষা করুন।’ বরং বলবেন, ‘আমি এই দেশের নাগরিক, রাষ্ট্র আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে।’ এতে নাগরিক অধিকার আরও শক্তিশালী হবে।”

কিন্তু এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হিন্দু নেতারা। তাদের মতে, এই মন্তব্য বাস্তবতার পরিপন্থী। কারণ, দেশে হিন্দুরা যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তার মূল কারণই তাদের ধর্মীয় পরিচয়। একজন সম্প্রদায় নেতা বলেন, “আমাদের বলা হচ্ছে হিন্দু পরিচয় ভুলে যেতে। কিন্তু আমাদের ঘরবাড়ি, মন্দির, দোকানপাট সব হিন্দু পরিচয়ের কারণেই পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি নাগরিক হিসেবে আমাদের সমানভাবে দেখত, তবে এত হত্যা ও লুটপাট কেন হতো?”

সংখ্যালঘু নেতাদের ক্ষোভ

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ আজ ‘দ্য ভয়েস’-কে বলেন, “একজন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা যখন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশের হিন্দুরা আজ নিপীড়িত সংখ্যালঘু। ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর সারাদেশে আমাদের ওপর যে অমানবিক হামলা হয়েছে, তা বিশ্বের সামনে লুকানো সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “ইউনুস নিজেই আগের এক বক্তব্যে স্বীকার করেছিলেন যে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়েছে, এবং সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে ঘটেছে। এখন তিনি সবকিছু অস্বীকার করছেন। আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই যে আমরা বাংলাদেশি। এই দেশ প্রতিষ্ঠায় আমরা সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছি, অথচ আজও আমরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত সম্প্রদায়।”

সহিংসতা ও সরকারের অস্বীকার

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, নারীদের ওপর সহিংসতা এবং সম্পত্তি দখলের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৪ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে অন্তত দুই হাজার সহিংস ঘটনার শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। এর মধ্যে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও মন্দিরে হামলা।

অন্যদিকে, ড. ইউনুস এই সব ঘটনার খবরকে ‘ভুয়া সংবাদ’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ চালানোর অভিযোগ এনে তিনি বলেন, “ভারতের এখনকার একটি বিশেষত্ব হলো ভুয়া খবরের বন্যা। মন্দিরে হামলার যেসব খবর ছড়ানো হয়েছে, তার অধিকাংশই গুজব। এগুলো আসলে স্থানীয় জমি বা প্রতিবেশী বিরোধ, ধর্মীয় ঘৃণার কারণে নয়।”

কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ‘পরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা’ চালানো হয়েছে। গাজীপুর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, হিন্দু বসতিগুলো ধ্বংস করা হয়েছে, এবং পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।

ভয়, হতাশা ও দেশত্যাগের প্রবণতা

বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমশ কমছে। একসময় তারা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ, এখন তা নেমে এসেছে ৮ শতাংশের নিচে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর অনেক হিন্দু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকায় পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা রোকসানা পারভিন বলেন, “রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুরক্ষা না পেলে নাগরিকত্ব কাগজে-কলমে থেকে যায়, বাস্তবে থাকে না। এই মুহূর্তে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতারও পরীক্ষা।”

ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুরাই ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর প্রধান টার্গেট। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তারা আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন সেই সম্প্রদায়ই আবার পরাধীনতার ভয়াবহতার মুখে পড়েছে।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক দীপঙ্কর দত্ত বলেন, “যে সম্প্রদায়টি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছে, আজ সেই সম্প্রদায়ই ভয় ও নির্বাসনের মধ্যে বাঁচছে। আরও দুঃখজনক হলো—যারা একসময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় রয়েছে।”

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের USCIRF সম্প্রতি ঢাকাকে সতর্ক করে বলেছে, “বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।” ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে ভারত কূটনৈতিকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লি সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে যেতে চাইছে না—কারণ এতে বাংলাদেশ আরও বেশি ইসলামপন্থী প্রভাব বা চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে।

‘আমাদের দেবতাদেরও নিরাপত্তা নেই’

গোপালগঞ্জের কদমতলায় অগ্নিসংযোগে ঘরহারা এক বিধবা বলেন, “আমরা নাগরিক, কিন্তু সমান নই। আমাদের দেবতাদেরও এখন পুলিশের পাহারা নেই।” অনেকে এখনো আশা করেন, বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চেতনা একদিন ফিরবে। কিন্তু প্রতিদিনের হামলা, অস্বীকার ও অবিচারের মধ্যে সেই আশার আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে আজ প্রশ্ন একটাই—এই দেশের নাগরিক হয়ে কি হিন্দু থাকা সম্ভব?

spot_img