রাজধানী ঢাকায় “বেওয়ারিশ লাশের” সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত নয় মাসে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ৪৯২টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে—যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৭৮। অর্থাৎ এক বছরে বেওয়ারিশ লাশ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক সমকাল এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
লাশের পাহাড়, উত্তর নেই কারও
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গ এবং আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম থেকে সংগৃহীত তথ্য বলছে—শুধু এই তিনটি হাসপাতালেই অচেনা ও অদাবিকৃত লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। বেওয়ারিশ লাশ দাফনের দায়িত্বে থাকা এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান জানায়, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা ৪৬৮টি লাশ দাফন করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষে আরও ২৪টি লাশ মর্গে পড়ে আছে, যেগুলোর পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, “পুলিশ, হাসপাতাল বা মর্গ থেকে আমরা এসব লাশ পাই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সের লাশই আমাদের হাতে আসে।”
স্বপ্নের শহর, অচেনা মৃত্যু
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পাড়ি জমান ঢাকায়—পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ব্যবসার আশায়। কিন্তু এদের অনেকেরই স্বপ্ন শেষ হয় মর্গে। কেউ খুনের শিকার, কেউ ছিনতাইয়ে, কেউ বা সড়ক দুর্ঘটনা, আগুন কিংবা আত্মহত্যায়। মৃত্যুর পরও অনেকের পরিচয় মেলে না; পুলিশ তাদের তালিকাভুক্ত করে ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হিসেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, “গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে আসা অনেকেই শহরের প্রান্তিক জীবনে আটকে যান। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মানসিক চাপ থেকে অনেক সময় তৈরি হয় আত্মহত্যা বা অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি।”
অপরাধ বাড়ছে, খুনি অজানা
অপরাধবিজ্ঞানে ‘বেওয়ারিশ লাশ’ সংখ্যা বেড়ে যাওয়া সমাজে আইন-শৃঙ্খলার অবনতির সূচক বলে বিবেচিত। কারণ, যখন কোনো হত্যার শিকার ব্যক্তির পরিচয় মেলে না, তখন তদন্তের চাপও কমে যায়—ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, “যখন অচেনা লাশের সংখ্যা বাড়ে, সেটি বোঝায় সমাজে বিচারহীনতা বাড়ছে। খুনিরা জানে, ভিকটিমের পরিচয় না মিললে তারা রেহাই পাবে।”
নদীতে ভেসে ওঠা লাশ
ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে একই চিত্র। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩০১টি লাশ—যার অনেকগুলোতেই পাওয়া গেছে গলায় ফাঁস, হাত-পা বাঁধা বা বস্তায় মোড়ানো দেহ। নদী পুলিশ বলছে, গড়ে প্রতি মাসে ৪৩টি লাশ পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
গত আগস্টে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এক নারী ও শিশুসহ চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়, যাদের হাতে বাঁধা ছিল ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তা। চার দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া যায় এক যুবকের মস্তকবিহীন দেহ। এসব ঘটনায় তদন্তে অগ্রগতি না থাকলেও পুলিশ স্বীকার করেছে, “নদীগুলো এখন হত্যাকাণ্ড ঢাকার জায়গা হয়ে উঠেছে।”
দেশে হত্যাকাণ্ডও বেড়েছে
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২,৬১৬টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে—গড়ে প্রতি মাসে ৩২৭টি। গত বছর এই গড় ছিল ২৮৭।
অগাস্ট মাসে শুধু গণপিটুনিতেই নিহত হয়েছেন ২৩ জন, গৃহসহিংসতায় ৩০ নারী, শিশু হত্যায় ১৭ জন এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনাও বেড়েছে।
রাজধানীর রাতের খবর
গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে পুলিশ তিনটি লাশ উদ্ধার করে—একটি শহীদ মিনারের সামনে, একটি জাতীয় ঈদগাহের পাশে এবং আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের কাছে। পুলিশের ধারণা, তারা ফুটপাতে ঘুমানো গৃহহীন মানুষ ছিলেন। শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, “লাশে আঘাতের চিহ্ন নেই। অসুস্থতাজনিত মৃত্যু বলে ধারণা করছি।”
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এমন অনেক “অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা”র আড়ালে লুকিয়ে থাকে সহিংসতা বা অবহেলার মৃত্যু।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না সামাজিক সংকট?
বিশ্লেষকদের মতে, বেওয়ারিশ লাশের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা শুধু অপরাধ নয়—রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলনও বটে।
অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, “যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন রাজধানীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। ঢাকা আজ স্বপ্নের নয়, মৃত্যুর শহর।”
সামরিক–ইসলামপন্থী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ক্ষমতায় আসে সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস। তার শাসনামলে দেশজুড়ে খুন, নিখোঁজ ও সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।
শহরজুড়ে পাওয়া বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা যেন সেই অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। তদন্তে অগ্রগতি নেই, বিচার নেই—কিন্তু প্রতিদিন মর্গে জমছে নতুন লাশ।
গাজায় নয়, ঢাকা এখন লাশের শহর
যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদে আমরা “নামহীন মৃত্যুর” গল্প দেখি, এখন সেই বাস্তবতা ঢাকাতেও। প্রতিদিন পুলিশ ও আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের গাড়ি লাশ বহন করে যাচ্ছে শহরের গলি–রাস্তায়।
সন্ধ্যার পর মর্গের সামনে আলো জ্বলে, মানুষ আসে দেখে যায়, কেউ মেলে না আপনজনকে।
ঢাকা এখন শুধু বেঁচে থাকার শহর নয়—এ শহর এখন মৃত্যুরও রাজধানী।

