বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের ঘোষণার মাধ্যমে দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শুক্রবার জানানো হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত একটি ট্রাইব্যুনালের জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতে ওই কর্মকর্তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অথচ যে সব অপরাধের বিচারের কথা বলা হচ্ছে তা যুদ্ধাপরাধের অংশ মোটেই নয়।
ট্রাইব্যুনালটি গত সপ্তাহে ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, যার মধ্যে নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের পাঁচ সাবেক মহাপরিচালকও রয়েছেন।
সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক বিচারপ্রক্রিয়া’র সূচনা বলে আখ্যা দিলেও সেনাবাহিনীর ভেতর-বাইরের অনেকেই একে ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ ও ‘প্রো-লিবারেশন অফিসারদের নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখছেন।
সরকারের ইচ্ছাধীন বিচার
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে এটি সরকারের নিয়ন্ত্রিত বিচারপ্রক্রিয়া। সরকারের ইচ্ছানুযায়ী যার বিরুদ্ধে চায় তার বিরুদ্ধেই মামলা ও বিচার হবে, আর যাকে রেহাই দিতে চায় তাকেই রক্ষা করা হবে।
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আপাতত সশস্ত্র বাহিনীর আরও কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস এ খবর প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের দপ্তর থেকে আমরা জেনেছি, এই মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনীর আর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরিকল্পনা নেই।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শতাধিক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হতে যাচ্ছে— এমন গুজব প্রত্যাখ্যান করে শফিকুল আলম বলেন, “এই খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া গুজব।”
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “এটা বিচারের নামে স্বেচ্ছাচার। আদালত কার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করবে বা করবে না সেটা আদালতের বিষয়। কিন্তু সরকারের বা প্রসিকিউটরের পরিকল্পনায় যদি এসব হয়, তাহলে এটি বিচার নয়— এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।”
সেনা সদরের ব্রিফিং ও প্রশ্নবিদ্ধ গ্রেপ্তার
শনিবার সেনা সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান জানান, ৮ অক্টোবরের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা সদর দফতরে উপস্থিত হন এবং পরে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “গ্রেপ্তার কর্মকর্তারা এখন পরিবারের বাইরে অবস্থান করছেন এবং এটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই করা হয়েছে।” তবে আটক কর্মকর্তাদের অবস্থান বা আইনি সহায়তার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সেনাবাহিনীর একাধিক সূত্র দ্য ভয়েসকে জানিয়েছে, আটক হওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালটি বর্তমানে সেনাবাহিনী এবং ইসলামন্থী উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলছে বলে অভিযোগ আছে। ট্রাইব্যুনালটি শেখ হাসিনার সরকারে দায়িত্বে থাকা সেনা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মীদের গুম, নির্যাতন ও হত্যা-অভিযুক্ত করে মামলা গ্রহণ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা এবং মানবাধিকার কর্মীরা একে ‘রাজনৈতিকভাবে সাজানো মামলা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাইব্যুনালের দুটি মামলাই কেন্দ্র করে গঠিত টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (TFI) সেল এবং জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (JIC) — যেখানে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারা কাজ করেছেন। যারা অতীতে চরমপন্থীদের দমন করেছিলেন, এখন তাদেরই ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, “এই কর্মকর্তারাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশকে উগ্রপন্থী হুমকি থেকে রক্ষা করেছিলেন। এখন তাদের অপরাধী বানানো হচ্ছে।”
পুরনো অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে নিরাপদে
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইউনুস সরকার অতীতের বহু ভয়াবহ সামরিক নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সরকারি তথ্য ও মানবাধিকার রেকর্ড অনুযায়ী, বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে (২০০২-০৩) পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এ হেফাজতে অন্তত ৪৬ জন নিহত হন। পরে সংসদে একটি দায়মুক্তি আইন পাস করে সেনাবাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়, যা ২০১৫ সালে উচ্চ আদালত বাতিল করে দেয়।
সুতরাং ঐসব হত্যার ঘটনায় জড়িত সেনাসদস্যদের বিচার করার সুযোগ থাকলেও তাদের কাউকে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না।
২০০৭-০৮ সালের সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘ক্রসফায়ার’ ও নির্যাতনে ৩১৩ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, কিন্তু তাদেরও কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর জিজ্ঞাসাবাদে অন্তত ৭৮ জন সীমান্তরক্ষী সদস্য নিহত হন, যা নিয়েও কোনো তদন্ত হয়নি।
কিন্তু এসব পুরনো অপরাধের কোনো বিচার না করে বর্তমান সরকার বরং শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদেরই টার্গেট করছে— যারা জঙ্গিবাদ দমন ও প্রশাসনিক সংস্কারে ভূমিকা রেখেছিলেন।
‘বিচারের নামে প্রতিশোধ’
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচার আসলে বাংলাদেশের সেনা ইতিহাস পুনর্লিখনের একটি রাজনৈতিক প্রয়াস। প্রবাসী আইনবিদ ড. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “এটি ন্যায়বিচার নয়, এটি প্রতিশোধ। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, আজ তাদের অপরাধী বানানো হচ্ছে; আর অতীতের সামরিক অপরাধীরা রয়ে গেছে নিরাপদে।”
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “এই ট্রাইব্যুনাল ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়কদের অপরাধী বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দমননীতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর বাংলাদেশ এখন সেনা ও ইসলামপন্থী শক্তির প্রভাবে পরিচালিত এক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে।
একসময় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ড. মুহাম্মদ ইউনুস এখন এমন এক শাসনব্যবস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণগ্রেপ্তার, সংবাদপত্র দমন ও আওয়ামী লীগপন্থীদের নিপীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকার উৎখাতের পর গত এক বছরে ৪৪ হাজারেরও বেশি আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, শতাধিক মানুষ মারা গেছেন হেফাজতে। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিকে কার্যত নিশ্চুপ করে রাখা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধপন্থী কর্মকর্তাদের অবসর বা বদলির মাধ্যমে সরিয়ে দিয়ে ইসলামপন্থী ও বিদেশপ্রশিক্ষিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাসনে থেকেও কেন্দ্রবিন্দুতে শেখ হাসিনা
নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাইব্যুনালের অভিযোগপত্রে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে— এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরিদ নিজাম বলেন, “শেখ হাসিনা অপরাধের জন্য নয়, তার ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য বিচারাধীন। এটি তাকে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অপরাধে পরিণত
সরকার ‘জবাবদিহি ও মানবাধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র কথা বললেও বাস্তবে তারাই বিরোধী মত দমনে আইনের অপব্যবহার করছে।
সম্প্রতি ঘোষিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এ গোপন আটককে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী সেনা কর্মকর্তাদেরই গোপনে আটক রাখা হচ্ছে।
জাতির ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে
সেনাবাহিনীর ভেতরে এই নির্বাচিত বিচার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির পেশাগত নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যারা এক সময় দেশ রক্ষায় জীবন বাজি রেখেছিলেন, আজ তাদেরই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে— অথচ অতীতের প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে অক্ষত।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেন্দ্র করে গড়া এই জাতি আজ দেখছে, সেই চেতনার বাহক সেনা কর্মকর্তারাই আজ বিচারের নামে অপমানিত হচ্ছেন। এক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সংক্ষেপে বললেন, “তারা ন্যায়বিচারের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কবর দিচ্ছে।”

