ধানমন্ডিতে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেপ্তার

দমননীতি আরও কঠোর; অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

রাজধানীর ধানমন্ডিতে শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল আয়োজনের অভিযোগে আওয়ামী লীগ–সমর্থক পাঁচ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর একের পর এক দমন অভিযান চলার মধ্যেই এই গ্রেপ্তার ঘটনা ঘটেছে।

গ্রেপ্তারদের নাম—জুনায়েদ সরদার, মো. শয়ন, শিহাব, সোহরাব এবং ফয়সাল। পুলিশ জানিয়েছে, মোহাম্মদপুর থানার একটি টিম রাপা প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স এলাকা থেকে জুনায়েদ ও শয়নকে আটক করে, আর ধানমন্ডি থানার টিম সাইফুর কোচিং সেন্টারের সামনে থেকে অন্য তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়।

মিছিলের প্রস্তুতির সময় অভিযান

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে ধানমন্ডি–২৭ এলাকার রাপা প্লাজা সংলগ্ন স্থানে ৩৫–৪০ জন জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায় এবং দুজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে।

অন্যদিকে ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মোস্তফা তারিকুজ্জামান জানান, সাইফুর কোচিং সেন্টারের সামনে একই সময়ে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের কিছু সদস্য মিছিল আয়োজনের চেষ্টা করছিল। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে তিনজনকে সেখান থেকে আটক করে।

পুলিশ বলছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার’ অভিযোগে মামলা প্রক্রিয়াধীন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এসব অভিযোগ আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কারণ আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলকে ‘অবৈধ ঘোষণা’ করে দমন করা হচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান দমননীতি

মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সেনা–সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মে ২০২৫-এ সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির সব ধরনের কার্যক্রম—সভা, সমাবেশ, মিছিল, প্রকাশনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট—নিষিদ্ধ করা হয়।

সরকার দাবি করছে, এই পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জরুরি। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি আসলে রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো বলছে, এই আইনকে ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বিরোধীদের ভয় দেখানো, সাংবাদিকদের হয়রানি এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

ঝটিকা মিছিল—প্রতিবাদের নতুন রূপ

দলীয় অফিস বন্ধ, প্রকাশ্যে সমাবেশের অনুমতি না থাকায় আওয়ামী লীগের তরুণ ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ‘ঝটিকা মিছিল’ আয়োজন করে আসছেন। এই মিছিল সাধারণত হঠাৎ কয়েক মিনিটের জন্য অনুষ্ঠিত হয়—তারপর দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এতে প্রশাসনকে অপ্রস্তুত করে অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের বার্তা পৌঁছে দেয় আওয়ামী লীগ।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, মতিঝিল, উত্তরা ও ধানমন্ডিসহ একাধিক এলাকায় এমন ঝটিকা মিছিল হয়েছে। পুলিশের অভিযান, গোপন গ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতির মধ্যেও তরুণ নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

একজন গোপন আওয়ামী লীগ কর্মী ‘দ্য ভয়েস’কে বলেন, “আমরা এখন ভয় আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নতুন পথ খুঁজছি। মিছিলের অনুমতি চেয়ে অপেক্ষা করলে কেউ শুনবে না, তাই আমরা হঠাৎ হাজির হচ্ছি।”

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দমননীতিতে আগস্ট ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত হাজারো মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে, অনেকে বিনা বিচারে আটক বা নিখোঁজ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যরাই সর্বাধিক।

অনেক রাজনৈতিক বন্দি চিকিৎসা, আইনজীবী কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও পাচ্ছেন না। অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব আটক ও দমন অভিযান দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে

আন্তর্জাতিক মহলে এখন উদ্বেগ বাড়ছে যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে গঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকারই শুরু থেকেই ফ্যাসিস্ট শাসন হিসেবে চেপে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দমননীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার এই পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিয়েছে। একটি বৃহৎ দলকে বাদ দিয়ে কোনো টেকসই রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

শুক্রবারের এই গ্রেপ্তারে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার এখন আগের চেয়েও বেশি স্নায়ুচাপে রয়েছে। গণসমর্থনহীন সরকার ভয় দেখিয়ে, মামলা দিয়ে, জেলে ভরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে।

কিন্তু ইতিহাস বলছে—বাংলাদেশে রাজনৈতিক শক্তি কখনও সম্পূর্ণ দমন করা যায়নি। আওয়ামী লীগের কর্মীরা এখন ছায়ার নিচে থেকেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, এবং এই প্রতিবাদ অধিকতর সংগঠিত শক্তি হয়ে আরও দৃঢ়ভাবে মাঠে ফিরবে।

spot_img