পাকিস্তান-ভারত নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা

তালেবান হামলায় ১১ পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসলামাবাদের কড়া হুঁশিয়ারি, দিল্লির পাল্টা সতর্কবার্তায় অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়ছে

পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা জোরদার হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বুধবার বলেছেন, “ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা এখন বাস্তব।” তিনি এই মন্তব্য করেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওরাকজাই জেলায় সন্ত্রাসীদের হামলায় ১১ সেনা নিহত হওয়ার পর। নিহতদের মধ্যে দুজন ছিলেন কর্মকর্তা পদমর্যাদার সেনা সদস্য।

ওরাকজাইয়ের পাহাড়ি এলাকায় সেনারা গোয়েন্দা অভিযানে গেলে তারা তালেবান-সংঘবদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) যোদ্ধাদের গুলিতে পড়েন। পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি বাহিনী ১৯ জন টিটিপি সদস্যকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। হামলার পর থেকেই ইসলামাবাদ সরাসরি ভারতকে দায়ী করছে—দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের দাবি, দিল্লি তাদের সীমান্তে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিচ্ছে। ভারত অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

যুদ্ধের হুমকি ও রাজনৈতিক বার্তা

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু যুদ্ধের আশঙ্কা বাস্তব। যদি যুদ্ধ হয়, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল আমরা অর্জন করব, ইনশাআল্লাহ।” তিনি আরও দাবি করেন, পাকিস্তানের এখন আগের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সমর্থক আছে, আর ভারতের প্রভাব কমছে।

এই বক্তব্য পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ককে আবারও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। গত মে মাসেই দুই দেশের মধ্যে টানা চার দিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন। তখন পরিস্থিতি পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি হয়।

সেনাপ্রধানদের বৈঠক ও পাল্টা হুঁশিয়ারি

ঘটনার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা রাওয়ালপিন্ডিতে জরুরি বৈঠক করেন। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, “ভারত যদি নতুন কোনো ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ চাপিয়ে দিতে চায়, তবে পাকিস্তানও তার জবাবে ‘নতুন ধরনের কঠোর প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে।”

বিবৃতিতে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে “উসকানিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে অভিহিত করা হয়। পাকিস্তান মনে করছে, ভারতের ক্ষমতাসীন দল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সুবিধা নিতে “যুদ্ধবাজ মনোভাব” ছড়াচ্ছে।

দিল্লির পাল্টা বার্তা

ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, “পাকিস্তান যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তাহলে হয়তো তার মানচিত্রই বদলে যাবে।” তিনি আরও বলেন, “আগামীবার ভারত আগের মতো সংযম দেখাবে না।”

তার উল্লেখ করা “অপারেশন সিনদূর ১.০” ছিল গত মে মাসে কাশ্মীরের পাহালগামে এক ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রতিশোধে ভারতের সামরিক অভিযান, যেখানে নয়টি জঙ্গি শিবির ধ্বংসের দাবি জানায় দিল্লি। পাকিস্তান বলে, ওই হামলায় অন্তত ৩১ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয় এবং বেসামরিক স্থাপনা টার্গেট করা হয়।

চার দিন ধরে উভয় দেশ একে অপরের সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের ছয়টি যুদ্ধবিমান—যার মধ্যে তিনটি ফরাসি রাফাল—গুলি করে নামিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলে, তারা পাকিস্তানের অন্তত ১২টি বিমানঘাঁটি ও কয়েকটি এফ-১৬ ধ্বংস করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি

এই সংঘাত থামে ১০ মে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে। তিনি ঘোষণা দেন, “তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।” পাকিস্তান পরবর্তীতে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয় এবং তাকে কৃতিত্ব দেয় “একটি সম্ভাব্য পরমাণু যুদ্ধ” ঠেকানোর জন্য।

নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি

সম্প্রতি পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো এক পক্ষের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সীমান্তে সতর্ক অবস্থান

এখন পর্যন্ত কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অব কন্ট্রোল) এলাকায় যুদ্ধবিরতি বজায় আছে। তবে উভয় সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “সির ক্রিক এলাকায় পাকিস্তান কোনো ধরনের আগ্রাসন চালানোর চেষ্টা করলে ইতিহাস ও ভূগোল—দুটোই বদলে যাবে।”

সম্ভাব্য পরিণতি

বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জাতীয়তাবাদী মনোভাবের কারণে পরিস্থিতি যে কোনো সময় আবারও যুদ্ধের দিকে যেতে পারে। দুই দেশই পরমাণু শক্তিধর; ফলে সংঘাত শুরু হলে তা দ্রুত ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

একজন ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক বলেছেন, “যুদ্ধ শুধু সীমান্তেই থামবে না; এটি গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে।”

দুই দেশের সরকারই প্রকাশ্যে যুদ্ধ চায় না বললেও, সীমান্তে যে টানটান পরিস্থিতি চলছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে।

spot_img