বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এইচআরডব্লিউ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, অস্থায়ী সরকারের সময় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা বা সহিংসতার অভিযোগ আনা হলেও, এসব অভিযোগের প্রমাণ দুর্বল। সংস্থাটি বলছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এসব গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, অনেক গ্রেপ্তার ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, চিকিৎসা পাচ্ছেন না—যা আগের শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার অভিযোগের মতোই ভয়াবহ।
এইচআরডব্লিউর সমালোচনা
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, “অস্থায়ী সরকার যেন আগের সরকারের মতো একই ভুল না করে। কারাগারে বিরোধীদের ভরাট করে কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারের এখন উচিত নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা।”
‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ বিতর্ক
২০২৫ সালের মে মাসে সরকার সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওই আইন অনুযায়ী দলীয় সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। সরকার বলছে, এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তারা “দলীয় অপরাধীদের জবাবদিহি করতে চায়।”
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন এখন ভিন্নমত দমন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদও আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, নতুন আইনটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করবে এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সাবেক মন্ত্রীর মৃত্যুতে ক্ষোভ
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় হাসপাতালে মারা যান আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। গ্রেপ্তারের পর তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন। মৃত্যুর আগে হাসপাতালের শয্যায় হাতকড়া পরা অবস্থায় তার ছবি ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী অসুস্থ বা বয়স্ক বন্দিকে হাতকড়া পরানো বেআইনি। মানবাধিকার কর্মীরা একে “অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণ” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার ও মামলার বন্যা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৪৪ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশের বিচার প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি।
শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশই ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৯৭টি মামলা করেছে। এসব মামলায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এদিকে, “অপারেশন ডেভিল হান্ট” নামে বিশেষ অভিযানে আরও ১১ হাজার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার বলছে, তারা “রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে” জড়িত ছিল। কিন্তু বিরোধীরা বলছে, এটি আসলে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ধরার অভিযান।
আন্তর্জাতিক সমালোচনা
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা অস্থায়ী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কানাডার গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাটিক গভর্ন্যান্স (GCDG) জানিয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি পক্ষপাতমূলক ও অসম্পূর্ণ ছিল।
GCDG বলেছে, ওই প্রতিবেদন শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের সহিংসতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু হাসিনার পদত্যাগের পর যে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর—তা উপেক্ষা করেছে।
প্রতিবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়, জাতিসংঘের তদন্ত দল শুধুমাত্র জুলাই-আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময় নিয়ে অনুসন্ধান চালায়, যাতে ইউনুস সরকারের সময়কার সহিংসতা ধামাচাপা পড়ে যায়।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অস্থায়ী সরকার গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দেশে ভয়, দমননীতি ও সেনা-সমর্থিত শাসনের চিত্রই দেখা যাচ্ছে।

