ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দিয়েও হিদার নাইটের ব্যাটে পরাজিত বাংলাদেশ

গুয়াহাটিতে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই; সোহানা ও রাবেয়ার ব্যাটে লড়াই জমলেও শেষ হাসি হিদার নাইটের

গুয়াহাটির বারসাপারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে লড়াই হলো রোমাঞ্চে ভরা একদিনের। নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপ ২০২৫–এর এই ম্যাচে বাংলাদেশ নারী দল ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দিয়েও শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পেল না। ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞ অধিনায়ক হিদার নাইটের অপরাজিত ৭৯ রানের ইনিংসে শেষ পর্যন্ত চার উইকেটের জয় পায় তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বাংলাদেশ ম্যাচ হেরেছে, কিন্তু ক্রিকেট–বিশ্ব জিতে নিয়েছে তাদের লড়াইয়ের মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধা। কঠিন ব্যাটিং কন্ডিশনে ১৭৮ রান করেও ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলে দিয়েছিল টাইগ্রেসরা।

কঠিন উইকেটে দুর্দান্ত শুরু বাংলাদেশের

ইংল্যান্ড টস জিতে বোলিং নেওয়ার পরই বাংলাদেশ দল কিছুটা বিপাকে পড়ে। ষষ্ঠ ওভারেই ২৫ রানে দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ—রুবিয়া হায়দার ৪ রান করে ফেরেন, আর অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ফেরেন শূন্য রানে।

তবে চাপের মধ্যে একাই লড়েছেন তরুণ ব্যাটার সোহানা মোস্তারি। ১০৮ বল খেলে ৬০ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন তিনি, যা তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি। অন্য প্রান্তে একের পর এক উইকেট হারালেও সোহানা ছিলেন স্থির।

ইংল্যান্ডের স্পিন আক্রমণে বাংলাদেশ ব্যাটারদের ঘূর্ণিতে আটকে ফেলে। সোফি এক্লেস্টোন ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার—৩ উইকেট নেন মাত্র ২৪ রানে। তাঁকে সহায়তা করেন চার্লি ডিন (২/২৮) ও লিনসি স্মিথ (২/৩৩)।

রাবেয়ার ঝড়ো ইনিংস দলকে টেনে তোলে

বাংলাদেশের ইনিংসের শেষভাগে মাঠ কাঁপিয়ে দেন তরুণ অলরাউন্ডার রাবেয়া খান। মাত্র ২৭ বলে অপরাজিত ৪৩ রানের ইনিংস খেলেন তিনি—যার মধ্যে ছিল ৬টি চার ও একটি ছক্কা। তাঁর ঝোড়ো ব্যাটিংয়েই নির্ধারিত ৫০ ওভারের আগেই অলআউট হয়ে যাওয়া দল পৌঁছে যায় ১৭৮ রানে (৪৯.৪ ওভার)।

বাংলাদেশের এই সংগ্রহ মোটেও ছোট ছিল না, কারণ পিচে বল ঘুরছিল আর গতি ছিল ধীর। সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডের স্পিনাররা কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন ইনিংসের মধ্যভাগে।

মারুফা ও ফাহিমার দাপটে ইংল্যান্ড বিপদে

১৭৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের শুরুটাই হয় বিপর্যয় দিয়ে। বাংলাদেশের গতির প্রতীক মারুফা আক্তার প্রথম ওভারেই উইকেট নেন অ্যামি জোন্সকে (এলবিডব্লিউ)। পরে সপ্তম ওভারে আউট করেন ট্যামি বোমন্টকে, ইংল্যান্ড তখন ২৯ রানে ২ উইকেটে।

এরপর অভিজ্ঞ ন্যাট সিভার–ব্রান্ট (৩২) ও অধিনায়ক হিদার নাইট মিলে দলকে এগিয়ে নিলেও বাংলাদেশের ঘূর্ণিজাদু আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। ফাহিমা খাতুনের স্পিন আক্রমণে একে একে তিনজন ইংলিশ ব্যাটার সাজঘরে ফেরেন—তার মধ্যে ছিলেন সিভার–ব্রান্টও। স্কোরবোর্ডে তখন ৭৮/৫, ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বাংলাদেশের ফিল্ডাররা প্রতিটি বলে উদ্দীপ্ত—বোলারদের সঙ্গে গর্জে উঠছিল স্টেডিয়ামও। কিন্তু অভিজ্ঞ হিদার নাইট ছিলেন অনড়।

নাইটের ধৈর্যে ভর করে ইংল্যান্ডের জয়

যখন চাপ বেড়ে যাচ্ছিল, তখন হিদার নাইটের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডকে বাঁচায়। চার্লি ডিনের সঙ্গে অজেয় ৭৯ রানের জুটি গড়ে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেন তিনি। নাইট ১১৫ বলে অপরাজিত ৭৯ রান করেন, যাতে ছিল ৯টি চার। অন্য প্রান্তে ডিন ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন।

৪৬.১ ওভার শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ১৮২/৬, আর ৪ উইকেট হাতে রেখেই জয় পেয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বাংলাদেশের লড়াইয়ে প্রশংসা বিশ্বজুড়ে

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হিদার নাইট বলেন, “বাংলাদেশ দারুণ খেলেছে। তাদের বোলাররা আমাদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। এই জয়টা সহজ ছিল না।”

বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিও দলের লড়াই নিয়ে গর্বিত, “আমাদের ব্যাটাররা আরও একটু টিকলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। তবে রাবেয়া আর সোহানা যে মানসিকতা দেখিয়েছে, তাতেই বোঝা যায়—আমরা উন্নতির পথে।”

বাংলাদেশ নারী দলের এই লড়াই প্রমাণ করেছে, তারা আর দুর্বল দল নয়। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকেও তারা চাপে ফেলতে পারে—এটাই আজকের বড় অর্জন।

সংক্ষিপ্ত ফলাফল:
বাংলাদেশ ১৭৮ (সোহানা মোস্তারি ৬০, রাবেয়া খান ৪৩*, এক্লেস্টোন ৩/২৪)
ইংল্যান্ড ১৮২/৬ (হিদার নাইট ৭৯*, ফাহিমা খাতুন ৩/১৬, মারুফা আক্তার ২/২৮)
ইংল্যান্ড জয়ী ৪ উইকেটে

spot_img