মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক নীরব সিদ্ধান্তে দেশটি পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তাদের তৈরি উন্নত আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের (Missile) নতুন তালিকায়।
বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করলেও, ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের নথিতে দেখা যায়—পাকিস্তানকে যুক্ত করা হয়েছে AIM-120C8/D (AMRAAM) ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়চুক্তির তালিকায়।
এই চুক্তির সংশোধিত অংশের মূল্য প্রায় ৪১ কোটি ৬৮ লক্ষ ডলার, যা মূল চুক্তির মোট অঙ্ককে নিয়ে গেছে ২.৫১ বিলিয়ন ডলার-এ। চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রে-থিয়ন (Raytheon)-এর সঙ্গে। এই প্রকল্পে ন্যাটো জোটভুক্ত ও কিছু অ-ন্যাটো সহযোগী রাষ্ট্রও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কে নতুন উষ্ণতা
দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর এই পদক্ষেপকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৮ সালে সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে মতপার্থক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সামরিক সাহায্য স্থগিত করেছিল। এখন ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়ে ওয়াশিংটন যেন জানিয়ে দিচ্ছে—ইসলামাবাদের প্রতি তাদের আস্থার নতুন সূচনা ঘটছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষুদ্র চুক্তির উদ্দেশ্য হয়তো সীমিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ বা প্রাথমিক সরঞ্জাম প্রস্তুতি। তবে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় অস্ত্রচুক্তির পথ তৈরি করতে পারে।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি
পাকিস্তান বিমানবাহিনী ২০০৬-০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও AIM-120C5 সংস্করণের প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল। সেই ক্ষেপণাস্ত্রই ২০১৯ সালে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার সময় ব্যবহৃত হয় বলে পাকিস্তানের দাবি।
নতুন AIM-120C8 সংস্করণ আগের মডেলের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। এটি দূরপাল্লায় লক্ষ্যভেদে সক্ষম, ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী, এবং রাডার ফাঁকি দিতে পারদর্শী। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান এবার তার এফ-১৬ বহর আধুনিক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একজন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক বলেন, “এটি বড় কোনো অস্ত্র সরবরাহ নয়; বরং পাকিস্তানকে পশ্চিমা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত রাখার কৌশলগত প্রয়াস।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
এ বছরের জুলাই মাসে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধান জহির আহমেদ বাবর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তখন বিষয়টি তেমন আলোচিত না হলেও, এখন বোঝা যাচ্ছে সেটি সম্ভবত এই চুক্তির প্রাথমিক আলোচনা ছিল।
ভারত এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানাচ্ছে পাকিস্তানের কাছে উন্নত অস্ত্র না দেওয়ার জন্য। ভারত ইতিমধ্যেই নিজস্ব অস্ত্র প্রকল্প “অস্ত্রা” (Astra) ও ইউরোপীয় “মিটিওর” (Meteor) ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশযুদ্ধ এখন আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সতর্কতা ও প্রযুক্তিগত বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো অস্ত্রচুক্তি কার্যকর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের (Congress) অনুমোদন লাগবে। কিছু মার্কিন নীতিনির্ধারক পাকিস্তানের চীনের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করতে পারেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের বিদ্যমান যুদ্ধবিমানে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন সহজ কাজ নয়। এর জন্য সফটওয়্যার, রাডার এবং পাইলট প্রশিক্ষণে নতুন বিনিয়োগ দরকার হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভারসাম্য
এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে। পাকিস্তান যদি নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পায়, তাহলে ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।
তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক জটিল ভারসাম্যের খেলা। একদিকে তারা ভারতের সঙ্গে কৌশলগত মিত্রতা জোরদার করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ছিন্নও করতে চায় না। ফলে, এই ক্ষুদ্র চুক্তিই হয়তো দুই দেশের মধ্যে নতুন আস্থার ইঙ্গিত বহন করছে।

