রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার এক ফোনালাপে বৈশ্বিক কূটনীতির সবচেয়ে জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। রুশ গণমাধ্যম আরটি নিউজের বরাতে জানা গেছে, এই আলোচনায় দুই নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, এবং সিরিয়ার স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।
নেতানিয়াহু কথোপকথনের একপর্যায়ে পুতিনকে আগাম জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। তবে সৌজন্যের আড়ালে এই আলাপের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ দু’দেশই বর্তমানে ভয়াবহ সংঘাতে জড়িত—রাশিয়া ইউক্রেনে, আর ইসরায়েল গাজায়।
ট্রাম্পের নতুন “গাজা পরিকল্পনা” ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক তৎপরতা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন শান্তি রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছেন, যা “গাজা পরিকল্পনা” নামে পরিচিত। এতে ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি, হামাসের হাতে আটক ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি, এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির প্রস্তাব রয়েছে।
হামাস ও ইসরায়েল উভয় পক্ষই প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে, যদিও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও শর্তাবলী নিয়ে এখনো আলোচনার টেবিলে অচলাবস্থা রয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রেখে রাশিয়া এখন ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে একাধিক লক্ষ্য—ইরানের পরমাণু ইস্যুতে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, সিরিয়ায় রুশ সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে পারমাণবিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা।
পুতিন-ট্রাম্প সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
রুশ-ইসরায়েলি আলোচনার পটভূমিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—পুতিন ও ট্রাম্পের পুনরায় ঘনিষ্ঠ হওয়া। আগস্টে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় মুখোমুখি বৈঠক করেন, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। ইউরোপীয় নেতারা চেয়েছিলেন, ট্রাম্প যেন রাশিয়াকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করান, কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
তবুও এই বৈঠক রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগের দরজা খুলে দেয়, বিশেষ করে ‘নব সূচনা’ (New START) নামের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিয়ে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে।
পুতিন ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, রাশিয়া এক বছর আরও এই সীমা মেনে চলতে প্রস্তুত, যদি ওয়াশিংটনও সম্মত হয়। ট্রাম্প বলেছেন, “এটি শুনতে বেশ ভালো প্রস্তাব মনে হচ্ছে।” ক্রেমলিন এই মন্তব্যকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
ইরান ও সিরিয়া—দুই পুরনো ফ্রন্টে নতুন হিসাব
পুতিন ও নেতানিয়াহু ফোনালাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা করেছেন। রাশিয়া ও ইরান একসঙ্গে সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখলেও, ইসরায়েলের দৃষ্টিতে ইরানের পরমাণু অগ্রগতি একটি “অস্তিত্ব সংকটের হুমকি।” তাই মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন।
সিরিয়ায় রুশ সেনার উপস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েল নিয়মিতভাবে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। এই বাস্তবতায় পুতিন-নেতানিয়াহু আলোচনা উভয় পক্ষের জন্যই জরুরি—একদিকে যুদ্ধের উত্তাপ কমানো, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলেও, পুতিন এখনো মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব হারাতে চান না। ইসরায়েলও চায়, মস্কো যেন তেহরানের পাশে অতিমাত্রায় না দাঁড়ায়।
এক বহুমাত্রিক কূটনীতির প্রতিচ্ছবি
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ বর্তমান বিশ্ব কূটনীতির নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে—যেখানে সম্পর্ক আর স্থায়ী জোটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যক্তিনির্ভর কৌশল ও তাৎক্ষণিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত, ইরানের পারমাণবিক প্রশ্ন—সবই এখন একটি বৃহৎ বৈশ্বিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।
যুদ্ধবিরতির আশা এখনও ভঙ্গুর, কিন্তু আলোচনার দরজা খোলা। এবং এই মুহূর্তে বিশ্বের নজর পুতিন, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের দিকে—যেখানেই হয়তো আগামী দিনের কূটনীতির পথরেখা আঁকা হচ্ছে।

