মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের বিলিংস শহরে কয়লার নিলাম পুরো মার্কিন কয়লা শিল্পের অবসন্ন বাস্তবতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। নাভাহো জাতিগোষ্ঠীর মালিকানাধীন কোম্পানি নাভাহো ট্রানজিশনাল এনার্জি কোম্পানি (NTEC) মাত্র ১ লাখ ৮৬ হাজার ডলারের বিনিময়ে ১৬ কোটি ৭০ লাখ টন কয়লার খনি লিজ নিয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি টনের দাম পড়ছে মাত্র ০.০০১১ ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ পয়সারও কম।
এই দরপত্রটি ছিল গত এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় কয়লা লিজ বিক্রয়। অথচ সরকার এতে মাত্র একটিমাত্র দরপত্রই পেয়েছে। এতেই বোঝা যায় কয়লার বাজার কতটা ভেঙে পড়েছে।
কয়লার রাজত্ব থেকে পতন
কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে কয়লা ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি। কিন্তু এখন সেই যুগ শেষের পথে। একসময় পিবডি এনার্জি নামের আরেকটি কোম্পানি ওয়াইওমিং রাজ্যে কয়লার খনি কিনতে ৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিয়েছিল। সেখানে আজ একই ধরণের খনি বিক্রি হচ্ছে মাত্র কয়েক লাখ ডলারে।
মন্টানার এই খনিটি অবস্থিত পাউডার রিভার বেসিনে, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উৎপাদনশীল কয়লা অঞ্চল ছিল। নাভাহো কোম্পানির স্প্রিং ক্রিক মাইন নামের বিদ্যমান খনির পাশেই এই নতুন খনিটি অবস্থিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই খনি থেকে কয়লা কিনে যে পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলত, সেগুলো আগামী দশ বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে বলে ধারণা করছে বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বাইডেন প্রশাসন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় এই অঞ্চল থেকে কয়লা লিজ বিক্রি স্থগিত করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় বিক্রির অনুমতি দেয় “এনার্জি ডমিন্যান্স” বা জ্বালানি আধিপত্য নীতির অংশ হিসেবে। এই নীতির আওতায় কয়লা, তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
তবে বাস্তবতা হলো—বাজার আর আগের জায়গায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রে শত শত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো এখন সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক গ্যাস, সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকেছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা জেমস স্টক বলেছেন, “আজ যে কয়লা লিজ বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশই কখনও খনন করা হবে না।” তাঁর মতে, নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি না হলে, এই কয়লা মাটির নিচেই পড়ে থাকবে।
নাভাহো জাতিগোষ্ঠীর জন্য দ্বিধা
নাভাহো ট্রানজিশনাল এনার্জি কোম্পানি (NTEC) নাভাহো জাতির মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালে তারা ওয়াইওমিং ও মন্টানার তিনটি বড় কয়লা খনি কিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ কয়লা উৎপাদক হয়ে ওঠে। তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক জটিল বাস্তবতা—একদিকে অর্থনৈতিক টিকে থাকা, অন্যদিকে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা।
এই লিজ কেনার মাধ্যমে নাভাহোরা হয়তো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ধরে রাখতে চাইছে—যদি কোনোদিন কয়লার দাম বা চাহিদা ফের বাড়ে। কিন্তু পরিবেশবিদদের মতে, এটি একটি মৃত শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ছাড়া কিছু নয়।
কয়লার ভবিষ্যৎ কোথায়?
মন্টানার এই দরপত্রটি শুধু একটি ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, বরং সময়ের বার্তা—একসময়ের “কালো সোনা” এখন মূল্যহীন। পৃথিবী দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির যুগে প্রবেশ করছে, আর কয়লা হয়ে পড়ছে অতীতের প্রতীক।
মাত্র ১০ পয়সা মূল্যে বিক্রি হওয়া এই কয়লা আসলে জানিয়ে দিচ্ছে, মানব সভ্যতা এক নতুন শক্তির পথে হাঁটছে—যেখানে কয়লা নয়, থাকবে সূর্য, বাতাস আর প্রযুক্তির আলো।

