ঢাকা, অক্টোবর ২০২৫ — পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পার্বত্য তিন জেলায় আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের বিরুদ্ধে ২১টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
রবিবার সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের পর হত্যাসহ এসব ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই সময়ের মধ্যে ৬ জন নারী ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ৭টি ধর্ষণচেষ্টা, ১টি ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড, ৮টি যৌন হয়রানির ঘটনা এবং ৪ জন নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে।
পিসিজেএসএস-এর ভাষায়, “পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন কিছু নয়। বহু দশক ধরে অসংখ্য নারী ও শিশুকে এমন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, কিন্তু একটিও ঘটনায় আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি।”
বিক্ষোভ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ
খাগড়াছড়ি শহরে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নেয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই বিবৃতিটি আসল।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর, এক মারমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে আহুত অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে শহরে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরদিন, ২৮ সেপ্টেম্বর, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে গুইমারার রামসু বাজার এলাকায়। সেনাবাহিনী শক্তি প্রয়োগ করে। সেখানে তিনজন মারমা যুবক নিহত হন এবং ডজনখানেক মানুষ আহত হন।
পিসিজেএসএস জানিয়েছে, “এই ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগ পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে অন্তত ২২টি বড় সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে, যার অধিকাংশই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায়।”
বিচার দাবি ও ক্ষতিপূরণের আহ্বান
সংগঠনটি ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তাদের দাবি, ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বরের সহিংসতার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন হামলা রোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পুরোনো সমস্যা, নতুন বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম, অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—বাংলাদেশের একটি সংবেদনশীল অঞ্চল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভূমি বিরোধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা-সংকট বিরাজ করছে।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর সশস্ত্র সংঘর্ষ কমে এলেও এখনো ভূমি অধিকার, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন এবং উন্নয়ন বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ রয়ে গেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মনে করে, এসব জটিলতার মধ্যে নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন আগে থেকেই বলছে, পার্বত্য অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না। সামাজিক চাপ, ভয়ের সংস্কৃতি ও বিচারহীনতার কারণে অধিকাংশ নারী আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না।
মানবাধিকারকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার পরপরই অনেক সময় পুলিশি ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়, তদন্তও হয়রানিমূলক হয়ে পড়ে। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত না হলে এই সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
খাগড়াছড়ি অঞ্চলের এক মানবাধিকার সংগঠক বলেন, “প্রতিটি ঘটনার ন্যায়বিচার না হলে ভুক্তভোগীরা আরও নীরব হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে।”
সামনে পথ
পিসিজেএসএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য এলাকায় মোট ১০৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৫টি ঘটনার শিকার নারী ও শিশু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতন কেবল সামাজিক সমস্যা নয়—এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যু।
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষা করছে।

