মাদাগাস্কারে টানা বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রি রাজোয়েলিনা সেনাবাহিনীর জেনারেল রুফিন ফর্তুনাত জাফিসাম্বোকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের দাবি, দেশ এখন এমন এক নেতাকে চায় যিনি “শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।”
কিন্তু ”জেন- জি মাদা” নামে তরুণদের আন্দোলন সেনা কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছে, “রাজোয়েলিনা ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।”
টানা বিক্ষোভ ও সহিংসতা
২৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রথমে বিদ্যুৎ ও পানির ঘন ঘন বিভ্রাটের প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়। পরে এটি দুর্নীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো ইস্যুতে রূপ নেয়। রাজধানী আন্তানানারিভোসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে আসে।
জাতিসংঘের হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ২২ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। তবে সরকার এই তথ্য অস্বীকার করে বলেছে, এসব “গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের” ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সোমবারও রাজধানীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ারগ্যাস ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কয়েকজন তরুণ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
দক্ষিণের টোলিয়ারা ও উত্তরের ডিয়েগো সুয়ারেজ শহরেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে।
সামরিক নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকার
রাজোয়েলিনা এর আগে প্রধানমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান এনৎসে ও পুরো মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন। এরপরই জেনারেল জাফিসাম্বোকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সেনা কর্মকর্তাকে সরকারের শীর্ষপদে বসিয়ে প্রেসিডেন্ট সরাসরি সেনাবাহিনীর সমর্থন নিশ্চিত করতে চাইছেন।
২০০৯ সালে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় আসা রাজোয়েলিনা ২০১৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০২৩ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। তবে এবার তাঁর শাসনকাল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
দরিদ্র দেশ, অস্থির সময়
বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, মাদাগাস্কারের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পায়। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
রাজোয়েলিনা সরকারের সমালোচকরা বলছেন, তিনি দেশের উন্নয়নের চেয়ে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগী। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলে নয়, বরং “ভবিষ্যতের জন্য লড়ছে।”
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ শান্তিপূর্ণ সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা “জাতীয় সংলাপ” আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় নেতা ও সমাজকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। তবে আন্দোলনকারীরা বলছে, সংলাপ নয়—তারা বাস্তব পরিবর্তন চায়, যার শুরু হবে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দিয়ে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
রাজধানীর রাস্তায় এখনো শত শত তরুণের স্লোগান—“আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের লড়াই।” প্রেসিডেন্টের কৌশল তাঁকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ যদি আরও বাড়ে, তবে মাদাগাস্কার হয়তো আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।

