নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে নিজের দোকানের ভেতর গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (৬ অক্টোবর) গভীর রাতে, স্থানীয় থানার মাত্র দেড়শ গজ দূরত্বে। পুলিশ স্টেশনের এত কাছাকাছি এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ।
নিহত ব্যবসায়ী নারায়ণ পাল (৪০) মোহনগঞ্জ পৌরসভার রৌতপাড়ার মৃত নৃপেন্দ্র পালের ছেলে। তিনি থানামোড়ে পরিচিত মুদি দোকান ‘নারায়ণ স্টোর’-এর মালিক ছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয়রা দোকানের ভেতর তাঁর গলাকাটা লাশ দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সব দিক বিবেচনা করে তদন্ত চলছে। দোকানের পাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে দ্রুত।”
থানার পাশে হত্যা, ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয়রা
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানার এত কাছাকাছি এমন একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুলিশ কিছুই টের পায়নি। এলাকাবাসী বলছেন, রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করার সময় হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। কেউ কেউ এটিকে পরিকল্পিত হামলা বলেও দাবি করেছেন।
একজন স্থানীয় দোকানদার বলেন, “যেখানে পুলিশের চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটে, সেখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে? এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।”
এদিকে, ঘটনার পর মোহনগঞ্জ বাজার ও আশপাশের এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের দাবি—এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই হত্যাকাণ্ড আবারও সামনে এনেছে দেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যু। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, চলতি বছর আগস্টের পর থেকে দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই দুই হাজারের বেশি হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিচার হয়নি।
স্থানীয় হিন্দু নেতারা বলছেন, “এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যবসায়ীর নয়, এটি পুরো সংখ্যালঘু সমাজের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। আমরা রাষ্ট্রের কাছে সুরক্ষা চাই।”
তদন্তে গাফিলতি ও আইনের শাসনের প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এমন হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে। একাধিক ঘটনার পরও বিচার না হওয়ায় দেশে আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা কমছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতি—প্রশাসনিক রদবদল, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মানবিক আহ্বান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জেলার পুলিশ সুপার বলেছেন, “এই হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমরা তদন্তে বিশেষ দল নিয়োজিত করেছি।”
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
এক জীবনের অবসান, এক সমাজের আতঙ্ক
নারায়ণ পাল ছিলেন সবার প্রিয় একজন ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের ভাষায়, “তিনি কারও সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়িত ছিলেন না। শান্ত ও সৎ মানুষ ছিলেন।” এখন তাঁর মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি জেগে উঠেছে একটাই প্রশ্ন—সংখ্যালঘুদের জীবনের মূল্য কি ক্রমেই কমে যাচ্ছে?
মোহনগঞ্জের সেই ছোট দোকানটি এখন তালাবদ্ধ। দোকানের সামনে পড়ে আছে শুকনো ফুলের মালা, আর পাশে কাঁদছেন প্রতিবেশীরা। নারায়ণ পালের মৃত্যু যেন এক ব্যক্তির নয়, একটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিশ্বাসের মৃত্যু।

