মেদভেদেভ: আকাশে ড্রোন ইউরোপের জন্য যুদ্ধের অনুভব —রাশিয়ার হাত নেই

ইউরোপে রহস্যময় ড্রোন হামলায় চাপে মস্কো, মেদভেদেভের দাবি—রাশিয়া নয়, ইউরোপকেই যুদ্ধের ভয় দেখানো হচ্ছে

ইউরোপ জুড়ে একের পর এক রহস্যময় ড্রোন উড়তে দেখা যাচ্ছে। বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও সীমান্ত অঞ্চলে এসব ড্রোনের কারণে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এসব ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার অভিযোগ উঠলেও, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন—রাশিয়ার সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

সোমবার নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বার্তায় মেদভেদেভ লেখেন, “ইউরোপে যারা রাশিয়াপন্থী, তারা কোনো গোপন নির্দেশ না পেলে এমন কাজ করবে না। আমাদের এজেন্টরা নিজেদের অবস্থানে প্রস্তুত রয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই ঘটনার মূল বিষয় হলো, ইউরোপের মানুষ যেন নিজেরাই যুদ্ধের ভয় অনুভব করে। তারা যেন বুঝতে পারে যুদ্ধ কেমন জিনিস।”

মেদভেদেভ আরও অভিযোগ করেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “ক্ষুদ্রদৃষ্টি ইউরোপীয়রা এখন নিজের চামড়ায় যুদ্ধের ভয় টের পাচ্ছে। তারা যেন জবাইয়ের পথে হাঁটা পশুর মতো কাঁপছে।”

ইউরোপের প্রতিক্রিয়া

মেদভেদেভের দাবির পরও জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন, “আমরা ধরে নিচ্ছি এই ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়ার হাত রয়েছে।”
মিউনিখ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক ড্রোন অনুপ্রবেশের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।

জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বোরিস পিস্তোরিয়াস বলেছেন, “আমরা আমাদের আকাশসীমা সুরক্ষায় নতুন রাডার ও অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসানোর কাজ শুরু করেছি। তবে রাশিয়ার উসকানিতে আমরা কোনো অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়াব না।”

ডেনমার্কেও একই ধরনের ড্রোন দেখা গেছে। কপেনহাগেন বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়। দেশটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠান ও সামরিক মহড়ার সময় ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পরিকল্পনা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এখন একটি বড় উদ্যোগ নিচ্ছেন—“ড্রোন ওয়াল” নামে পরিচিত নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা। এতে থাকবে উন্নত সেন্সর, সিগন্যাল জ্যামার ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তি, যা সীমান্ত পেরিয়ে আসা ড্রোন শনাক্ত করতে পারবে।

পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও নরওয়াসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোও আকাশ নজরদারি জোরদার করেছে। গত সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের আকাশে প্রায় ২৩টি অজ্ঞাত ড্রোন প্রবেশ করলে দেশটি ন্যাটোর জরুরি ধারা আর্টিকেল ৪ কার্যকর করে। কয়েকটি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য সরাসরি হামলা নয়—বরং ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরীক্ষা করা এবং ভয়-উদ্বেগ ছড়ানো। এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে হাইব্রিড যুদ্ধ, যেখানে সাইবার আক্রমণ, বিভ্রান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপই মূল অস্ত্র।

মেদভেদেভের বক্তব্য শুধু দায় অস্বীকার নয়; এতে লুকিয়ে আছে একটি বার্তা—“ইউরোপ, যুদ্ধের ভয় অনুভব করো।”

তিনি এই ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়া একদিকে সরাসরি অংশগ্রহণ অস্বীকার করছে, অন্যদিকে ইউরোপে অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে—এমন মন্তব্যও এসেছে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।

বর্তমানে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একযোগে তদন্ত চালাচ্ছে। কেউ এখনো কোনো দেশ বা সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি, তবে পরিস্থিতি ঘিরে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

spot_img