মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তায় ভর করে টিকে থাকা বাংলাদেশের অদৃশ্য শ্রমজীবী মানুষ

প্রতিদিন আয় করলেই খাবার জোটে—এমন বাস্তবতায় বেঁচে আছেন ৬ কোটিরও বেশি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, যাঁদের ঘামে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি

ঢাকার ব্যস্ততম মোড়ে প্রতিদিন সকালে শুরু হয় ৩২ বছর বয়সী সাবিহা খাতুনের বাঁচার লড়াই। ফুটপাতের এক পাশে কাঠের অস্থায়ী টেবিল পেতে বিক্রি করেন মুড়ি, চানাচুর আর ভাজাভুজি। যাদের কাছে বিক্রি করেন—তারা সবাই তাঁর মতোই পরিশ্রমী মানুষ: রিকশাচালক, দিনমজুর, অফিসগামী।

ভালো দিনে আয় হয় প্রায় ৬০০ টাকা। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই বা প্রশাসন ফুটপাত খালি করলে, আয় অর্ধেকে নেমে আসে। “তেল, চাল, সবজির দাম এখন দ্বিগুণ, কিন্তু আয় আগের মতোই। কখনো কখনো আমি নিজে না খেয়ে বাচ্চাদের খেতে দিই,” বলেন সাবিহা, কপাল মুছতে মুছতে গরম তেলে বেগুনি ভাজার ফাঁকে।

জীবিকার জন্য কাজ, কিন্তু নিরাপত্তা নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাবিহার মতো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি—যারা প্রতিদিন কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত।

গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, হকার, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই মিলে তৈরি করেছেন দেশের অর্থনীতির অদৃশ্য ভিত্তি। অথচ তাঁদের নেই কোনো নিয়োগপত্র, নেই ছুটি, নেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা বীমা।

কার্মজীবী নারী ও এফইএস বাংলাদেশের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে সবচেয়ে বেশি কাজ হয় খুচরা বিক্রি, কৃষি, পশুপালন, খাদ্য ও পানীয় বিক্রি, পরিবহন এবং কারুশিল্পে। তাঁদের প্রায় ৬৯ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৪ বছর, আর এই খাত থেকে আসে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ থেকে ৪৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা এই খাতকে বলেন “বাংলাদেশের উন্নয়নের অদৃশ্য ইঞ্জিন”—যা প্রতিদিন দেশকে এগিয়ে নেয়, অথচ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।

মূল্যস্ফীতির চাপে নিঃস্ব জীবিকা

চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০.০৩ শতাংশে—যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ, ১০.৭০ শতাংশ। চালের দাম একাই খাদ্যস্ফীতির ৫০ শতাংশের বেশি দায় বহন করছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ।

চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর এম. শরিফুল হক বলেন, “অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের আয় মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। খাবারের দাম বাড়লে তারা কম খায়, ধার করে, বা সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।”

তাঁর ভাষায়, “তাদের জীবনে কোনো নিরাপত্তা নেই। একদিন আয় বন্ধ মানে পরদিন অনাহার।”

রাস্তার মানুষদের গল্পই বাংলাদেশের গল্প

৩২ বছর বয়সী মাহবুব হোসেন মোটরবাইক চালিয়ে জীবিকা চালান। প্রতিদিন সকালেই মাথায় হেলমেট পরে ছোট্ট প্রার্থনা করেন—“আজ যেন পরিবারের খরচটা উঠে যায়।” ভালো দিনে আয় হয় ৭০০–৮০০ টাকা, কিন্তু জ্বালানি, কমিশন আর মোবাইল ডেটার খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে মাত্র ৪০০ টাকা। “পিঠে ব্যথা, চোখ ঝাপসা। তবু না চালালে ঘরে চুলা জ্বলে না,” বলেন তিনি।

অন্যদিকে, কামরাঙ্গীরচরে রিকশাচালক সুবোধ রায়, বয়স ৪৫। সারা দিন ঘাম ঝরিয়ে ৭০০ টাকা আয় করেন। রিকশা ভাড়া দিতে হয় ১৫০ টাকা, খাবার খরচ ৪০০। কিছুই থাকে না। “যদি অসুস্থ হই বা রিকশা নষ্ট হয়, বাচ্চারা না খেয়ে থাকে। কেউ সাহায্য করে না,” বলেন সুবোধ।

এই বাস্তবতা শুধু সুবোধ বা সাবিহার নয়, এটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের গল্প—কাজ আছে, কিন্তু নিশ্চয়তা নেই।

শ্রম সংস্কারের দাবিতে জোর

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)–এর নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আইনি স্বীকৃতি ছাড়া এই শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত করা সম্ভব নয়। তারা রাষ্ট্রীয় নীতিতে অদৃশ্য।”

চলতি বছর কমিশন কয়েকটি বড় সংস্কারের প্রস্তাব দেয়—

  • জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ,
  • নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা সম্প্রসারণ,
  • বেতন পুনর্বিবেচনা তিন বছর পরপর,
  • অবদানভিত্তিক সামাজিক বীমা চালু,
  • সংকটকালীন জরুরি তহবিল গঠন,
  • ডিজিটাল শ্রমিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু,
  • এবং চাকরির ১৫ দিনের মধ্যে নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকরা প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতে পারেন।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের অবস্থা এক। বাংলাদেশে যেখানে ৮৫ শতাংশ কর্মজীবী অনানুষ্ঠানিক খাতে, ভারতে তা ৮০–৮২ শতাংশ, নেপালে ৯০ শতাংশেরও বেশি। চুক্তি নেই, স্বাস্থ্যসুবিধা নেই, নিশ্চিন্ত জীবনও নেই।

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর আওতায় শ্রমিকদের খুব কম অংশ আসে। আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল। ফলে দুর্ঘটনা বা অসুস্থতা মানেই কর্মহীনতা ও দারিদ্র্য।

অদৃশ্য মেরুদণ্ডের দৃশ্যমান বেদনা

অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই বলেন—বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাত হচ্ছে “হাড়বিহীন মেরুদণ্ড”; দেশের উন্নয়ন এর ওপর দাঁড়িয়ে, অথচ এর শ্রমিকরা অবহেলিত।

সাবিহা খাতুনের কথাতেই হয়তো ধরা পড়ে কোটি মানুষের জীবনের সারকথা: “আমি বিলাসিতা চাই না, শুধু চাই প্রতিদিন যেন আমার বাচ্চারা না খেয়ে না থাকে।”

এই একবাক্যই যেন মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দেশের এই অদৃশ্য শ্রমিকদের জীবনও নিরাপত্তা ও মর্যাদায় ভরবে।

spot_img