গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রথম ধাপের চুক্তি: ট্রাম্পের ঘোষণা, হামাস–ইসরায়েল বন্দি বিনিময়ে সম্মত

কাতার, মিশর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অগ্রগতি; তবে গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত, মানবিক সংকট আরও গভীর।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাঁর প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েল ও হামাস সম্মত হয়েছে।

বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছি যে ইসরায়েল ও হামাস আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সই করেছে। খুব শিগগিরই সব বন্দি মুক্তি পাবে এবং ইসরায়েল সেনারা নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে।”

কী আছে প্রথম ধাপে

চুক্তির প্রথম ধাপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—

  • গাজায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
  • হামাসের হাতে থাকা ৪৮ জন ইসরায়েলি বন্দি মুক্তি, যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
  • ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি।
  • গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মজিদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, “চুক্তির সব ধারা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। বিস্তারিত শিগগিরই জানানো হবে।”

মধ্যস্থতায় সক্রিয় ভূমিকা

মিশরের শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, মিশর ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। আলোচনায় ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ইসরায়েলের কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রী রন ডারমার এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

হামাসের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন খালিল আল-হাইয়া ও জাহের জাবারিন—যারা সম্প্রতি দোহায় ইসরায়েলি হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান। এছাড়া ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ সংগঠনের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা ইজ্জাত আল-রিশেক বলেন, কাতার, তুরস্ক ও মিশরের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ আলোচনায় “নতুন গতি” এনেছে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

তবে সবকিছু এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান জটিলতা রয়ে গেছে—

  • ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা ও পরিধি।
  • যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসনিক কাঠামো।
  • হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্ন।

আল জাজিরার বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, “হামাস মনে করছে বন্দি বিনিময়ের পর যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।”

গাজায় হামলা অব্যাহত

আলোচনার মাঝেই গাজায় ইসরায়েলি হামলা থামেনি। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত আটজন নিহত ও ৬১ জন আহত হয়েছেন।

গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে ইসরায়েলি বাহিনী ২৭১টি বিমান ও আর্টিলারি হামলা চালিয়েছে। এতে ১২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

মানবিক বিপর্যয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৪টি আংশিকভাবে চালু আছে। ১৭৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক-তৃতীয়াংশ কার্যকর। বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের মারাত্মক সংকট চলছে।

WHO–এর আঞ্চলিক পরিচালক হানান বালখি বলেন, “কিছু হাসপাতাল একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ভেঙে গেছে, ওষুধ নেই, বিদ্যুৎ নেই।”

ভয়াবহ প্রাণহানি

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রায় দুই মিলিয়ন বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েল বলছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে বন্দি করা হয়।

সামনে কী

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি হয়তো এই সপ্তাহের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে সফরে যাবেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাঁর সরকার চুক্তি অনুমোদনের জন্য বৈঠক করবে।

যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি হবে ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং গাজা যুদ্ধের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তবে চলমান হামলা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে স্থায়ী শান্তির পথ এখনও অনিশ্চিত।

spot_img