ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বহুল প্রত্যাশিত বৈঠকেও কোনো সমাধান না আসায়। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্ন মাত্র চার সপ্তাহ দায়িত্বে থেকে পদত্যাগ করার পর দেশজুড়ে নতুন নেতৃত্ব সংকট দেখা দিয়েছে। শুক্রবার এলিসি প্রাসাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা অংশ নিলেও, বৈঠক শেষে স্পষ্ট হলো—কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
সমঝোতার আশায় ব্যর্থ বৈঠক
ম্যাক্রোঁর এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল পার্লামেন্টে স্থবিরতা দূর করে একটি কার্যকর সরকার গঠন করা। তবে বৈঠকে তিনি ডানপন্থী মেরিন লে পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি (RN) এবং বামপন্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোর নেতৃত্বাধীন ফ্রান্স আনবো (LFI)-এর প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাননি। এতে করে অনেকেই মনে করছেন, ম্যাক্রোঁ সচেতনভাবেই দুই প্রান্তের শক্তিগুলোকে আলোচনার বাইরে রাখছেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট ও সবুজ দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট তাদের মতামত শুনেছেন ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা নতুন সরকারের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলেননি। কিছু সূত্র জানায়, ম্যাক্রোঁ তার বিতর্কিত পেনশন সংস্কার বিল স্থগিত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদিও বামপন্থী দলগুলো তাতে আশ্বস্ত নয়। তারা বলেছে, নীতিগত পরিবর্তনের পরিষ্কার নিশ্চয়তা ছাড়া ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে কোনো সরকারকে সমর্থন দেওয়া সম্ভব নয়।
সংকটে সরকার, সীমিত বিকল্প
ম্যাক্রোঁর দল বর্তমানে সংসদে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তার উপর আবার লেকর্নের পদত্যাগ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন নির্ভর করছে সাময়িক জোট ও সমঝোতার ওপর।
অন্যদিকে, মধ্য-ডানপন্থী দল লে রিপাবলিকানসও (Les Républicains) সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ম্যাক্রোঁর জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া একটি রাজনৈতিক ভারসাম্যের খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত আটটার মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছিলেন।
সংক্ষিপ্ত মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী
সেবাস্তিয়ান লেকর্নের মেয়াদ ফরাসি ইতিহাসের অন্যতম সংক্ষিপ্ত। মাত্র এক মাস আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু সংসদে তার প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সরকারের নীতিগত অচলাবস্থা তাকে চাপে ফেলে। শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের সমালোচনা এবং বিরোধীদের চাপের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, ম্যাক্রোঁ লেকর্নকেই আবার ফিরে আসতে অনুরোধ করেছেন। এলিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট তাকে “আরও ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা” গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। লেকর্ন জানিয়েছেন, “দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে” তিনি আবারও দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
পেনশন সংস্কার নিয়ে বিতর্ক
ফ্রান্সে ম্যাক্রোঁর পেনশন সংস্কারই বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম মূল কারণ। এই সংস্কারের মাধ্যমে অবসরের বয়স বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিরোধী দলগুলো এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ব্যাপক বিক্ষোভের পরও ম্যাক্রোঁ তা পাস করাতে চাইলে সংসদে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এখন সংকট নিরসনের জন্য প্রেসিডেন্ট সেই সংস্কার বিল স্থগিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
অর্থনীতি ও সময়ের চাপ
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে ফ্রান্সের ওপর। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ এখন জিডিপির ১১০ শতাংশের বেশি। নতুন সরকারকে আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ২০২৬ সালের বাজেট উপস্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থান জানার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিরোধীদের অবস্থান
ডান ও বাম উভয় প্রান্তের প্রধান দলগুলো—লে পেনের ন্যাশনাল র্যালি এবং মেলঁশোর ফ্রান্স আনবো—বৈঠক থেকে বাদ পড়ায় সরকারের বিরুদ্ধে আস্থা ভোট আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক, সবুজ ও কমিউনিস্ট দলগুলো শর্তসাপেক্ষ সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বলছে, ম্যাক্রোঁ যদি সামাজিক নীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বাস্তব পরিবর্তন আনেন, তবেই তারা সহায়তা করবে।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
ফ্রান্স এখন রাজনৈতিকভাবে এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। সংসদে সমর্থনহীন প্রেসিডেন্টের জন্য এটি এক বড় পরীক্ষার সময়। নতুন প্রধানমন্ত্রী যদি দ্রুত বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হন বা আস্থা ভোটে হেরে যান, তাহলে আবারও আগাম নির্বাচন ডাকার বিকল্পই হয়তো বাকি থাকবে না।
তবে আপাতত ম্যাক্রোঁ চাইছেন, এই অচলাবস্থা ভেঙে স্থিতিশীল সরকার গঠন করে অন্তত ২০২6 সালের বাজেট পাস নিশ্চিত করতে। বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্তই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

