নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাটিং ব্যর্থতায় বড় হারে বাংলাদেশ

ভালো বোলিংয়ে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ধস, ১০০ রানের ব্যবধানে হেরে কঠিন অবস্থায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের লড়াই ভালোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেনি। গৌহাটির বারাসপাড়া স্টেডিয়ামে নারী বিশ্বকাপের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাটে-বলে লড়াই করেও ১০০ রানে হেরেছে নিগার সুলতানার দল। শুরুতে বোলিংয়ে প্রতিশ্রুতিমূলক পারফরম্যান্স দেখালেও ব্যাটিং ব্যর্থতায় ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

শুরুটা আশাব্যঞ্জক

নিউজিল্যান্ড টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পরই বাংলাদেশের বোলাররা তাদের চাপে ফেলে দেয়। তরুণ লেগ-স্পিনার রাবেয়া খান (৩/৩০) দুর্দান্ত স্পেল করে শুরুতেই দুই উইকেট তুলে নেন। তার সঙ্গে নাহিদা আক্তার (১/৩৬) ও ফাহিমা খাতুন (১/৩৭) নিয়মিত লাইন-লেংথ বজায় রেখে কিউই ব্যাটারদের অস্বস্তিতে রাখেন।

সুজি বেটস (২৯) রান আউটে ফেরেন, আর জর্জিয়া প্লিমার (৪) ও আমেলিয়া কের (১) দ্রুত বিদায় নিলে স্কোরবোর্ডে তখন নিউজিল্যান্ডের রান মাত্র ৩৫/৩। তখন মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের বোলাররা হয়তো প্রতিপক্ষকে ১৮০ রানের মধ্যেই আটকে দিতে পারবে।

অভিজ্ঞ দুই ব্যাটারের ঘুরে দাঁড়ানো

কিন্তু সেই আশায় জল ঢেলে দেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক সোফি ডিভাইন ও মিডল-অর্ডারের ব্যাটার ব্রুক হ্যালিডে। দুজনই দারুণ ধৈর্য ও শৃঙ্খলা দেখান। বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের বিপক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ শট না খেলে এক-দুই নিয়ে রান তুলতে থাকেন তাঁরা।

চতুর্থ উইকেটে এই জুটি গড়ে তোলে ১১২ রানের পার্টনারশিপ—যা পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ডিভাইন ৮৫ বলে ৬৩ ও হ্যালিডে ১০৪ বলে ৬৯ রান করেন। শেষের দিকে ম্যাডি গ্রিন ও লিয়া তাহুহু মিলে রান তোলার গতি বাড়ালে নিউজিল্যান্ড ৫০ ওভারে সংগ্রহ করে ২২৭ রান।

বাংলাদেশের বোলাররা শুরুতে ভালো করলেও শেষ দশ ওভারে নিয়ন্ত্রণ হারায়। কয়েকটি সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ায় ও ফিল্ডিংয়ে অমনোযোগিতায় নিউজিল্যান্ডের স্কোর বেড়ে যায় ২২০-এর ওপরে।

রান তাড়ায় ব্যাটিং ব্যর্থতা

২২৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। রোজমেরি মায়ার ও জেস কেরের গতিময় বোলিংয়ে পাওয়ারপ্লেতেই পড়ে যায় তিন উইকেট। ওপেনার দিশা বিশ্বাস (৯) দ্রুত আউট হন, এরপর ফারজানা হক ও নিগার সুলতানা ফিরলে চাপ বাড়ে।

ফাহিমা খাতুন (৩৪), রাবেয়া খান (২৫) ও নাহিদা আক্তার (১৭) কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও সেটি ম্যাচে ফেরার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ৩৯.৫ ওভারে ১২৭ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।

অধিনায়কের হতাশা

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি বলেন, “আমরা শুরুতে ভালো বল করেছিলাম, কিন্তু শেষের দিকে অনেক রান দিয়ে ফেলেছি। ব্যাটাররা ধারাবাহিক হতে পারছে না—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বড় দলগুলোর বিপক্ষে পার্টনারশিপ গড়তে না পারলে জেতা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা বড় দলের সঙ্গে কেবল বিশ্বকাপে খেলি, তাই অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকেই। বোলাররা নিয়মিত ভালো করছে, এখন ব্যাটারদের দায়িত্ব নিতে হবে।”

ডিভাইনের দৃঢ়তা ও প্রেরণা

অন্যদিকে ম্যাচসেরা সোফি ডিভাইন বলেন, “এই জয় আমাদের জন্য খুব দরকার ছিল। শুরুতে বাংলাদেশ চমৎকার বল করেছে। আমরা জানতাম, ধৈর্য ধরে খেলতে পারলে ভালো স্কোর করা সম্ভব।”

ডিভাইন জানান, ইনিংস চলাকালে তার শারীরিক অবস্থাও ভালো ছিল না। “আমি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, ইনিংস চলাকালে সুগার লেভেল কমে যাচ্ছিল। তবু চেষ্টা করেছি মনোযোগ ধরে রাখতে। মাঠে সবকিছুই চ্যালেঞ্জের অংশ,” বলেন তিনি।

কোথায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দল এখনো ভারসাম্য খুঁজে পায়নি। বোলিংয়ে ধারাবাহিকতা থাকলেও ব্যাটিংয়ে আক্রমণাত্মক মানসিকতা ও অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট। প্রথম ১৫ ওভারে উইকেট না হারিয়ে রান তোলার পরিকল্পনা করতে না পারলে বড় দলের বিপক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।

এই হারে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের অবস্থান কঠিন হয়ে পড়েছে। বাকি ম্যাচগুলো জিততে না পারলে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের পরের ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতা কাটিয়ে নতুন সূচনা করাই এখন নিগার সুলতানার দলের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের জন্য এই জয় তাদের বিশ্বকাপ যাত্রায় নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। তবে তারাও জানে—ডিভাইনের কাঁধে সব দায়িত্ব টিকিয়ে রেখে দীর্ঘপথে টিকে থাকা কঠিন হবে।

spot_img