ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ঘটনার এক বছর পর নিশ্চিত হলো নেপালি তরুণ বিপিন জোশীর পরিণতি। মাত্র ২৪ বছর বয়সী এই যুবক ছিলেন হামাসের হাতে বন্দি হওয়া কয়েক ডজন বিদেশি শ্রমিকের একজন। সোমবার রাতে হামাস কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের কাছে চারজন মৃত জিম্মির দেহ ফেরত দেয়, যার মধ্যে ছিলেন বিপিন জোশী।
বিপিনের গল্প শুরু হয়েছিল আশার মধ্য দিয়ে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে “লার্ন অ্যান্ড আর্ন” (Learn and Earn) নামের কৃষিশিক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের দেশ নেপাল ছেড়ে ইসরায়েলে যান। কিবুতজ আলুমিম (Kibbutz Alumim) নামের একটি কৃষি ফার্মে তিনি কমলালেবুর বাগানে কাজ করছিলেন। শান্ত স্বভাবের, পরিশ্রমী এই তরুণকে সবাই বলতেন “সবসময় হাসিখুশি বিপিন”। কিন্তু ৭ অক্টোবরের সেই ভয়াল দিনে তাঁর জীবন বদলে যায় চিরতরে।
সহকর্মীদের রক্ষাকারী বিপিন
হামাসের সশস্ত্র যোদ্ধারা যখন কিবুতজে হামলা চালায়, তখন বিপিন ছিলেন কয়েকজন নেপালি সহকর্মীর সঙ্গে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায়, তিনিই প্রথম সবাইকে সতর্ক করেন এবং আশ্রয়ের খোঁজে নেতৃত্ব দেন। তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপে কয়েকজন নেপালি ছাত্র বেঁচে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপিন নিজে ধরা পড়েন হামাসের হাতে। সেদিন মোট ১০ জন নেপালি নিহত হন, ৫ জন আহত হন, আর কেবল একজন প্রাণে বেঁচে যান।
এরপর দীর্ঘ এক বছর ধরে তাঁর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয় না। প্রতিদিন তাঁরা খবরের আশায় তাকিয়ে ছিলেন কাঠমান্ডুর আকাশের দিকে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর নিশ্চিত খবর
রবিবার রাতে নেপালের ইসরায়েলস্থ রাষ্ট্রদূত ধনপ্রসাদ পাণ্ডে সাংবাদিকদের জানান, “আমরা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক খবর পাইনি। বন্দি বিনিময়ের বিষয়ে কিছু নিশ্চিত নয়।” কিন্তু সোমবার রাতে হামাসের প্রকাশিত তালিকায় বিপিন জোশীর নাম দেখা যায়—চারজন মৃত জিম্মির মধ্যে একজন হিসেবে। বাকি তিনজন ইসরায়েলি নাগরিক: গাই ইলুজ, ইয়োসি শারাবি ও ড্যানিয়েল পেরেজ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফি ডেফ্রিন নিশ্চিত করেছেন, “হামাস সোমবার সন্ধ্যায় চারটি মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে।” মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিওগুলো জানিয়েছে, দেহ শনাক্তে ফরেনসিক পরীক্ষার পরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
বিপিনকে “নায়ক” বলছে সহপাঠীরা
বিপিনের সহকর্মী ও শিক্ষকরা তাঁকে একবাক্যে ‘নায়ক’ আখ্যা দিয়েছেন। কিবুতজ আলুমিমের এক শিক্ষক বলেন, “বিপিন যদি আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যেত, তাহলে আরও অনেকের প্রাণ যেত। সে নিজের জীবন দিয়ে অন্যদের বাঁচিয়েছে।”
নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল পার্বতী বলেছেন, “বিপিন জোশী নেপালি তরুণদের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার।”
পরিবারের আর্তনাদ
কাঠমান্ডুতে বিপিনের গ্রামের বাড়িতে এখন শোকের ছায়া। তাঁর মা বলেছেন, “সে বলেছিল কাজ শিখে ফিরে আসবে, এখন ফিরছে কাঠের বাক্সে।” প্রতিবেশীরা নীরবে তার আত্মার শান্তির প্রার্থনা করছে।
হামাসের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও নতুন উত্তেজনা
বিপিনের দেহ ফেরত এলেও হামাসের এই আংশিক ফেরত ইসরায়েলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বন্দিদের পরিবার সংগঠন “হোস্টেজ ফ্যামিলিজ ফোরাম” জানিয়েছে, হামাস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জীবিত ও মৃত—সব জিম্মিকে সোমবারের মধ্যেই ফেরত দেবে। কিন্তু তারা মাত্র চারজনের দেহ হস্তান্তর করেছে। সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “চুক্তি ভঙ্গের এমন আচরণের কঠোর জবাব দেওয়া উচিত। সরকার ও মধ্যস্থতাকারীদের দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বিদেশি শ্রমিকদের অদৃশ্য মানবিক কাহিনি
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সবচেয়ে উপেক্ষিত অধ্যায় হলো বিদেশি শ্রমিকদের জীবন। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার শত শত তরুণ ইসরায়েলে কাজ করছিলেন কৃষি ও নির্মাণ প্রকল্পে। তাঁদের কেউ কেউ বন্দি হয়েছেন, কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু বড় রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁদের নাম প্রায় অনুপস্থিত।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বিদেশি শ্রমিকদের মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা বিশেষ তদন্তের দাবি রাখে। “বিপিনের মতো মানুষদের গল্প বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের বলি শুধু সৈন্যরা নয়, হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণও,” বলেন এক মানবাধিকার কর্মী।
শেষ অধ্যায়: ফিরে এলেন, তবে জীবিত নন
ইসরায়েল এখনো আশা করছে, সব মৃতদেহ ফেরত পাবে। কিন্তু নেপালের জন্য বিপিন জোশী এক অনন্ত স্মৃতি। তাঁর মৃত্যু শুধু এক পরিবারের ক্ষতি নয়—এটি সেই সব শ্রমজীবী তরুণদের প্রতীক, যারা উন্নত জীবনের আশায় ঘর ছাড়ে কিন্তু ফেরে কফিনে।

