বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তথাকথিত গুমের অভিযোগে মামলা দিয়ে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে, তখন আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা দাবি তুলেছেন—পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময় সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোকেও একইভাবে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলে ১,১৯৯ জন মানুষকে বিচারবহির্ভূত হত্যা [cgs-bd.com] এবং ২০০৭–০৮ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৩৩৩ জন মানুষ হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনে অথবা তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত [তথ্যসূত্র: cgs-bd.com, Refworld, forum-asia.org, sabrang.com] হওয়ার ঘটনাগুলোও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
তারা বলছেন, বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলসহ বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের সেনা হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার এই সরকার আমলে শুরু হলে বিচারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ ও পক্ষপাতের অভিযোগ কেটে যাবে।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ড. শাহদীন মালিক, ড. বাদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং নূর খান লিটন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো যেন একধরনের রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়।
তারা চাচ্ছেন, ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধপন্থী অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে, অথচ পূর্ববর্তী সরকারগুলোর অধীনে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় মদদের হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় এড়িয়ে যাচ্ছে — ব্যাপারটা যেন এমন না হয়।
Also Read: Selective Justice or Political Purge?
মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজ্ঞরা বলছেন, ইউনুসের সরকারের গৃহিত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত একপাক্ষিক। আশা করি তা এমন থাকবে না। অতীতের সেনা ও রাজনৈতিক শাসনামলে সংঘটিত শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্টদের বিচার করা হলে বা আদর্শগত দিক থেকে মানুষকে বাছাই করে বিচার করলে প্রশ্ন উঠবে।
“ন্যায়বিচার কখনো বাছাই করে হয় না”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ভয়েসকে বলেন, “ন্যায়বিচার কখনো একপাক্ষিক হতে পারে না। কোনো সরকার যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে, অথচ পূর্ববর্তী সরকারের অপরাধগুলো উপেক্ষা করে—তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়, সেটি প্রতিশোধ।”
গত ৮ অক্টোবর সরকারপক্ষ ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলে আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। শেখ হাসিনা এবং তাঁর শাসনামলের বর্তমান ও সাবেক উচ্চ ও মধ্যপদস্থ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুটি মামলায় “গুম, গোপন আটক” এবং “নির্যাতন”-এর অভিযোগ আনা হয়। এরপর গত ১২ অক্টোবর সেনাবাহিনী ঘোষণা করে, ১৫ জন অফিসারকে আটক করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ”সশস্ত্র বাহিনীর অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পরিকল্পনা সরকারের নেই।
“প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এই বিবৃতি প্রমাণ করে যে এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারনিয়ন্ত্রিত একটি বিচার প্রক্রিয়া—অর্থাৎ তারা যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেপ্তার ও বিচার করবে, আর যাকে ইচ্ছা তাকে রেহাই দেবে,” ভয়েসকে বলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাসিম। তিনি বলেন, “এটি বিচারের নামে স্বেচ্ছাচারিতা যা প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেরই বহিঃপ্রকাশ।”
পড়ুন: বাছাইকৃত বিচার: মুক্তিযুদ্ধপন্থী সেনা কর্মকর্তাদের নির্মূল করার মিশন?
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “উচ্চপর্যায় থেকে দায়িত্বহীন বিবৃতি ও পদক্ষেপ সরকারবিরোধী অভিযোগকে শক্তিশালী করে। ফলে তারা সহজেই বলতে পারছে, বর্তমান সরকার বিচারের নামে সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘ক্লিনসিং অপারেশন’ চালানো চালাচ্ছে।”
“আমরা প্রকৃত বিচার দেখতে চাই; রাজনৈতিক অন্যায় দেখতে চাই না — সেনাবাহিনীর বা অন্য কারও উপরই না” বলেন তিনি।
তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, বিচারের নামে সেনাবাহিনীতে নিধন অভিযান চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধপন্থী অফিসারদের সরিয়ে ইসলামপন্থীদের নিয়ে নতুন সেনা কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে—যা শারিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ।
অপারেশন ক্লিন হার্ট ও দায়মুক্তির শেকড়
৭১এর যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল যখন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ঘটনাগুলর বিচার করছে, তখন অতীতের রক্তপাতের নথিপত্র প্রায় অছোঁয়া থেকে গেছে।
সরকারি ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার ২০০১–২০০৬ মেয়াদে প্রায় ১,২০০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ২০০৪ সালে গঠিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সে সময় অন্তত ৩৬৭টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। বাকী ৮৩২ জনকে হত্যা করে পুলিশ, প্যারামিলিটারি বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযানের একটি ছিল “অপারেশন ক্লিন হার্ট”, যা চলে ২০০২ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এ অভিযানে অংশ নেয় ২৪,০২৩ জন সেনা ও ৩৩৯ জন নৌসদস্য, সঙ্গে ছিল বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর), পুলিশ ও আনসার। সরকারি তথ্যমতে, এতে ১১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়, অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়, এবং অন্তত ৪৪ জন সেনা হেফাজতে মারা যায়। [সূত্র: ডেইলি স্টার]
অন্যান্য সূত্রে সংখ্যা আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, ওই অভিযানে ৬০ জন নিহত হয়েছিলেন। [bdnews24.com] আর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০০২ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রথম দিকে ৩১ জনের মৃত্যু ঘটে এবং পরে আরও ১৫ জন নিহত হয়—অর্থাৎ অন্তত ৪৬টি মৃত্যু সরাসরি এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত। [Refworld]
ঢাকার এক এলাকায় ৩৮ বছর বয়সী দোকানদার করিমকে (ছদ্মনাম) ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় সেনারা। তাঁর স্ত্রীকে বলা হয়েছিল, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দুই দিন পর তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায় হাসপাতালে। সরকারি প্রতিবেদনে লেখা ছিল—“হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু।” কিন্তু তাঁর দেহে পাওয়া আঘাতের চিহ্ন বলছিল অন্য কথা।
অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় না এনে অভিযানের পর বিএনপি-জামায়াত সরকার সংসদে পাস করে “যৌথবাহিনী দায়মুক্তি আইন, ২০০৩”। এর মাধ্যমে অভিযানে অংশ নেওয়া সব সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে আইনি দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। [omct.org] সংসদ একে বলেছিল “প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা”, কিন্তু মানবাধিকারকর্মীরা একে বলেন “রাষ্ট্রের অনুমোদিত হত্যার লাইসেন্স।” [Emory Law Scholarly Commons]
এই আইনটি বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের পরিপন্থী ছিল। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন তখন মন্তব্য করেছিলেন, “এই আইন কার্যত সন্দেহভাজনদের নির্যাতন ও হত্যার নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।”
দীর্ঘ বারো বছর পর, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৫ সালে উচ্চ আদালত এক রায়ে আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য বিচার চাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। [newagebd.net] কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো বিচার হয়নি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন ভয়েসকে বলেন, “দায়মুক্তির আইন বাতিল হয়েছে, কিন্তু বিচার এখনো কবরের নিচে চাপা পড়ে আছে। পরিবারগুলো ভয় পায়, কেউ কেউ এত দরিদ্র যে রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য নেই।”
মানবাধিকারকর্মী ড. বাদিউল আলম মজুমদার বলেন, “খালেদা জিয়া এবং তাঁর নির্দেশে যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন—তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। আইনের শাসন রক্ষার স্বার্থে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সেনাবাহিনী, বিডিআর, র্যাব ও পুলিশ—সব বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য এতে জড়িত থাকায় বাস্তবে সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
বিভিন্ন সরকারের আমলে একই ধারা
অপারেশন ক্লিন হার্টের পরেও হত্যাকাণ্ডের এই ধারা থামেনি। অধিকার ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি সরকারের সময়ে অন্তত ১,১৯৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে র্যাব গঠনের পর দুই বছরে ৩৬৭ জন নিহত, বাকিরা পুলিশের বা সেনা অভিযানে প্রাণ হারান।
২০০৭–২০০৮ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যে দেখা যায়, ওই দুই বছরে মোট ৩৩৩ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন—২০০৭ সালে নিহত হন ১৮৪ জন, আর ২০০৮ সালে ১৪৯ জন।
এই হত্যাগুলোর বেশিরভাগই সরকারি প্রতিবেদনে “হার্ট এটাক”, “ক্রসফায়ার” বা “বন্দুক যুদ্ধে নিহত” বলে উল্লেখ করা হয়—যা আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যার নামমাত্র ব্যাখ্যা।
যেসব সেনা কর্মকর্তা এসব অভিযানে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সে সময় ছিলেন তরুণ ক্যাপ্টেন, আর এখন কেউ কেউ জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই আজ পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “অপরাধের বিচার শাসকের ইচ্ছার বিষয় হতে পারে না। যদি ইউনুস সরকার সত্যিই ন্যায়বিচার চায়, তবে বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা আওয়ামী লীগ—সব সরকারের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ডে বিচার প্রযোজ্য করতে হবে।”
র্যাব সৃষ্টি ও ভয়কে স্বাভাবিক করে তোলার সংস্কৃতি
২০০৪ সালের মার্চে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়তে ইসলামীর সরকারের সময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠিত হয়। ঘোষণায় বলা হয়েছিল—এটি হবে একটি “অপরাধ দমনের অভিজাত বাহিনী।” কিন্তু গঠনের পরের আড়াই বছরে র্যাবের হাতে কমপক্ষে ৩৬৭ জন মানুষ নিহত হয়, যাদের অনেকেই হেফাজতে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, এসব হত্যার একটি নির্দিষ্ট ধারা ছিল—কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হতো, তারপর বলা হতো তাকে নিয়ে “অস্ত্র উদ্ধার করতে” গেছে, আর কিছুক্ষণ পর সংবাদ আসত সে “ক্রসফায়ারে নিহত।” আশ্চর্যের বিষয়, এসব ঘটনায় র্যাব সদস্যরা প্রায় কখনোই আহত হতেন না।
র্যাবের নেতৃত্বে শুরু থেকেই সেনা ও পুলিশের মাখামাখি। প্রথম মহাপরিচালক আনোয়ারুল ইকবাল এবং তাঁর উত্তরসূরি আবদুল আজিজ সরকার দুজনেই ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, কিন্তু গোয়েন্দা ও অপারেশন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ছিলেন সেনা কর্মকর্তা—যেমন লে. কর্নেল চৌধুরী ফজলুল বারী, লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ এবং কর্নেল মো. মাহবুবুল আলম মোল্লা। ২০০৬ সালের শেষ নাগাদ র্যাবের ১২টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে ৮টি-এর নেতৃত্বে ছিলেন সেনা লেফটেন্যান্ট কর্নেল।
বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ র্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে “নির্যাতনের” অভিযোগ তুলেছে। অথচ এই বাহিনীটির জন্মই হয়েছিল খালেদা জিয়ার আমলে—যে সময় এটি বিএনপি-সমর্থিত সামরিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ আছে। বিএনপি যে র্যাবকে প্রতিষ্ঠা করেছিল তারাই একসময় এর শিকার হয়েছে এবং এখন বলছে র্যাব বিলুপ্ত করা উচিত। [newagebd.net]
মূলত র্যাবের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা, কিন্তু কার্যত এর মূল কাঠামো গড়ে উঠেছিল সেনা বাহিনীর অফিসারদের দ্বারা। এই দ্বৈত নেতৃত্বের কারণে জবাবদিহি ছিল অস্পষ্ট, আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে একাধিক সরকারের আমলে।
বিভিন্ন সরকারের আমলে র্যাবে দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তারা
বিএনপি সরকার (অক্টোবর ২০০১ – অক্টোবর ২০০৬):
র্যাব সদর দপ্তর থেকে ইউনিট পর্যায় পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের মধ্যে:
- কর্নেল মো. মাহবুবুল আলম মোল্লা – উপপরিচালক, র্যাব সদর দপ্তর
- লে. কর্নেল আসিফ আহমেদ আনসারি – অপারেশন প্রধান ও র্যাব-১ এর কমান্ডিং অফিসার
- লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ – গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান
- লে. কর্নেল চৌধুরী ফজলুল বারী – র্যাব-১ এর প্রাথমিক কমান্ডার (২০০৪)
- লে. কর্নেল সাইদ সাইদিস সাকলায়েন, লে. কর্নেল মির্জা ইজাজুর রহমান, লে. কর্নেল বদরুল আহসান, লে. কর্নেল শামসুল হুদা, লে. কর্নেল হাশিনুর রহমান, লে. কর্নেল এরশাদ হোসেন, লে. কর্নেল নুরুল মোমেন খান, লে. কর্নেল মানিকুর রহমান ও লে. কর্নেল হুমায়ুন ববির—বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
২০০৬ সালের শেষ দিকে র্যাবের ১২টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে ৮টিই সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল।
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৭–২০০৮):
এই সময়ও সেনা কর্মকর্তারা নেতৃত্বে ছিলেন।
- কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) হন।
- লে. কর্নেল আসিফ আহমেদ আনসারি ২০০৭ সালে গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
আওয়ামী লীগ সরকার (২০০৯–২০২৪):
এই সময়ে অন্তত ১১ জনেরও বেশি সেনা কর্মকর্তা র্যাবের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন।
- অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন): ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান (২০১৩–২০১৬), কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (২০১৬–২০১৮), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (২০১৮–২০১৯), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সোরওয়ার (২০১৯–২০২১), কর্নেল খান মোহাম্মদ আজাদ (২০২১–), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান (২০২২–২০২৩), কর্নেল মাহবুব আলম (২০২৩–২০২৪), এবং কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন (২০২৪–বর্তমান)।
- অন্যান্য পদে ছিলেন: লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ (গোয়েন্দা প্রধান, ২০১৭ সালে অপারেশন টোয়াইলাইটে নিহত), লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ (র্যাব-৭ এর কমান্ডার; ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত), এবং লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (র্যাব-১১ এর কমান্ডার; নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত)।
মোট হিসাব: বিএনপি আমলে ১৩, তত্ত্বাবধায়ক আমলে ২, আর আওয়ামী লীগ আমলে ১১ জনেরও বেশি সেনা কর্মকর্তা র্যাবের নেতৃত্বে ছিলেন।
র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার পরিসংখ্যান
- মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের হাতে ৩৬৭ জন নিহত হন। [Human Rights Watch]
- ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪০৯ জন নিহত হন। [The Daily Star]
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭–২০০৮) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, শুধু ২০০৮ সালেই র্যাবের হাতে ৬৮ জন নিহত হয়, আর ২০০৭ সালের প্রথম ২১০ দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মোট ১২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। [Refworld]
- অধিকার-এর হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০১–২০০৯) মোট ১,৫৩৪ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে বিএনপি আমলে ১,২২১ জন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে ৩১৩ জন।
- শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭–২০০৮ সালে বিভিন্ন বাহিনীর হাতে মোট ৩৩৩ জন মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ১৮৪ জন, ২০০৮ সালে ১৪৯ জন।
তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যাচ্ছে, র্যাবের জন্ম বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে, প্রভাব বিস্তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, আর টিকে থাকা ও সম্প্রসারণ ঘটে আওয়ামী লীগ আমলে। বাহিনীটির নেতৃত্বে সব সময়ই সেনা অফিসারদের উপস্থিতি ছিল প্রবল, যা এর জবাবদিহি ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে—সরকার বদলালেও ভয় ও বিচারহীনতার এই কাঠামো অপরিবর্তিত থেকেছে।
বিডিআর বিদ্রোহের পর
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম সামরিক ট্র্যাজেডি—বিডিআর বিদ্রোহ। ওই ঘটনায় নিহত হন ৭৪ জন, যাদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। ঘটনাটির পর হাজার হাজার সীমান্তরক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা পরবর্তীতে বিশ্বের বৃহত্তম গণবিচারগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
২০১৩ সালে ঢাকার একটি আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও শতাধিককে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ৭৮ জন অভিযুক্ত বিডিআর সদস্য জেলে মারা যান—এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৫১ জন, ২০১০ সালে ২০ জন এবং ২০১১ সালে ৭ জন। অনেকের দেহে ছিল স্পষ্ট নির্যাতনের চিহ্ন। তাদেরকে হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলা হয়েছিল। [The Daily Star].
নবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “তারা সবাই দোষী ছিল — এমন কথা প্রমাণের আগে বলা যায় না। এগুলো সবই হত্যা। হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই বিচারহীন থাকতে পারে না। যদি শেখ হাসিনা বিডিআর জোয়ানদের নির্যাতনের নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকেও জবাবদিহি করতে হবে—কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে যারা হত্যা করেছে, তাদেরও আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। অর্ধেক সত্যের বিচার হতে পারে না।”
২০১৭ সালে হাইকোর্ট মামলাটির পুনর্বিবেচনায় ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৮৫ জন বিডিয়ার সদস্যের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখে, তবে একইসঙ্গে ‘ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া’ লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু হেফাজতে মারা যাওয়া ৭৮ জনের ঘটনায় আজও কোনো স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়নি।
নতুন বিচার, পুরনো ধারা
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসার পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাসহ ২৮ জনকে অভিযুক্ত করেছে—তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ “গুম, গোপন আটক” ও “নির্যাতন,” যা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সরকার একে বলছে “দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ,” কিন্তু সমালোচকরা একে দেখছেন “রাজনৈতিক প্রতিশোধ” হিসেবে। এসব বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ন্যায়বিচার একপাক্ষিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে না। যদি সরকার মুক্তিযুদ্ধপন্থী সেনা কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আগের শাসনগুলোর অপরাধ উপেক্ষা করে, তবে এটি ন্যায়বিচার নয়—এটি প্রতিহিংসা।”
মানবাধিকারকর্মী ড. বাদিউল আলম মজুমদারও একমত হয়ে বলেন, “খালেদা জিয়া এবং তাঁর নির্দেশে যারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, তাদেরও বিচার হতে হবে। কিন্তু একপাক্ষিক বিচার জনগণের আস্থা ধ্বংস করবে। সেনাবাহিনী, বিডিআর, র্যাব ও পুলিশ—সব বাহিনীর অপরাধই আইনের আওতায় আসতে হবে।”
সেনাবাহিনীতে রদবদল ও আদর্শিক পুনর্গঠন
সেনা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের রদবদল চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনেককে অবসরে পাঠানো হয়েছে বা স্থানান্তর করা হয়েছে, আর তুলনামূলক রক্ষণশীল ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, বলেন, “যারা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রক্ষায় কাজ করেছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ যারা ২০০২–০৩ আর ২০০৭–০৮ সালের বিভিন্ন বিতর্কিত অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
সমান বিচারের দাবি
আইনবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার ও ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজন সব সরকারের অপরাধের সমানভাবে বিচার। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “হাইকোর্টের আদেশে ২০০৩ সালের দায়মুক্তি আইন বাতিল ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এখন প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি বিচারের নীতিকে সব সরকারের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করবে?”
তিনি ও অন্যান্য আইনজ্ঞরা প্রস্তাব করেছেন, ২০০১–২০১১ সময়কালের সব রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্তে একটি ‘সত্য ও দায়বদ্ধতা কমিশন’ গঠন করা হোক। পাশাপাশি র্যাবে সেনা অফিসারদের ডেপুটেশন বন্ধ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণের আইনগত ব্যবস্থা করা উচিত।
জেনেভাভিত্তিক এক মানবাধিকার গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, “প্রতিপক্ষ বাছাই করে বিচার প্রকৃত ন্যায়বিচারের ধারণাকে কলঙ্কিত করে। এতে বোঝা যায়, কার শাস্তি হবে তা অপরাধ নয়, ক্ষমতাধারীর উপর নির্ভর করছে।”
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় এক দেশ
বাংলাদেশজুড়ে এখনো বহু পরিবার রয়েছে যাদের হাতে রয়েছে মৃত্যুসনদে লেখা “হার্ট ফেইলিওর”—যদিও তাদের তরুণ পুত্ররা নির্যাতনে মারা গিয়েছিল। কেউ চুপচাপ নিশ্চুপ হয়ে গেছে, কেউ প্রতিবছর ফিরে আসে সেই কবরের পাশে, যেখানে মৃত্যুর কারণ আজও অনিশ্চিত।
এক শোকাহত মা উচ্চ আদালতের সামনে ছেলের বিবর্ণ ছবি হাতে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার ছেলেকে যারা নিয়ে গিয়েছিল, তাদের নাম আজও কেউ উচ্চারণ করে না।”
বাংলাদেশ একটি দায়মুক্তি আইন বাতিল করেছে, কিন্তু দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখনো টিকে আছে—এই বিশ্বাস যে ক্ষমতাধারী মানেই রক্ষা পাওয়া। প্রতিটি সরকারই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের পরই বিচারপ্রক্রিয়া শূন্যে ফিরে যায়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের কথায়, “শুধু অপরাধীরাই দায়মুক্তি চায়। যতদিন না সব সরকার একই আদালতের মুখোমুখি হয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ততদিন ভয় ও প্রতিহিংসার আবর্তে বন্দি হয়ে থাকবে।”

