আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার যদি আওয়ামী লীগকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়, তাহলে তা হবে জনগণের ভোটাধিকার হরণের সমান।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, এএফপি এবং দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর সঙ্গে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, “আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও বটে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্র টিকবে না। এমন সরকার কখনোই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।”
নির্বাচন ও গণতন্ত্র থেকে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা
মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার গত মে মাসে ‘জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে’ আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করার পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, “যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তারা কীভাবে অন্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করতে পারে? এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের ইচ্ছার পরিপন্থী।”
তিনি আরও বলেন, “আমি এমন কোনো সরকারের অধীনে দেশে ফিরব না, যার ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর।”
অর্থনৈতিক সাফল্য থেকে নির্বাসনে
২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পরিণত করেন। শিল্পোন্নয়ন, নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে তার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র আন্দোলনের সহিংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর চাপে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। বর্তমানে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদক সম্প্রতি তাকে দিল্লির ঐতিহাসিক লোধি গার্ডেনে সকালে হাঁটতে দেখেছেন—পাশে দুইজন নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, “এখন আমি শান্তিতে আছি, তবে সতর্ক আছি। কারণ আমার পরিবারের ইতিহাসই বলে দেয়, বাংলাদেশে রাজনীতি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।”
তিনি স্মরণ করেন ১৯৭৫ সালের সেই রাতের কথা, যখন তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পরিবারের তিন ভাই সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। “আমরা বেঁচেছিলাম কেবল কারণ আমি ও আমার বোন তখন বিদেশে ছিলাম,” বলেন হাসিনা।
বিচার ও অভিযোগের মুখে শেখ হাসিনা
বর্তমানে শেখ হাসিনা অনুপস্থিত অবস্থায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তাকে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে বলপ্রয়োগে দমন-পীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নাটকীয় রূপ। যে আদালত চলছে তা একপেশে ও অবৈধ। আমি আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পাইনি।”
তিনি জানান, ঘটনাগুলোর সময় মাটিতে থাকা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। “একটি অস্থির পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তা আমার নির্দেশ ছিল না,” বলেন হাসিনা।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সহিংসতায় অন্তত ৩,৫০০ পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং প্রায় ৫০০ থানায় হামলা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই সংখ্যাকে অস্বীকার করে ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান
শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ ও স্থিতিশীলতাই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য। শুধুমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই দেশকে সুস্থ রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমার পরিবার বা আমি কেউই বাংলাদেশকে এককভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাই না। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার ওপর।”
দিল্লিতে নির্বাসিত থাকলেও শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তার সতর্কবার্তা যেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কি কোনো নির্বাচন সত্যিই জনগণের ভোটের প্রতিফলন হতে পারে?

