একদিনে ৩৫ হাজার শ্রমিক বেকার, প্যাসিফিক জিন্সের সাত কারখানা বন্ধ

শ্রমিকদের সংঘর্ষ ও অস্থিরতার জেরে চট্টগ্রামের শীর্ষ রপ্তানি প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের হঠাৎ কারখানা বন্ধ ঘোষণা

বাংলাদেশে এক দিনে বেকার ৩৫ হাজার কর্মী শ্রমিকদের দুই পক্ষের সংঘর্ষ, কারখানায় হামলা ও কর্মপরিবেশ না থাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য নিজেদের সাতটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ নামের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানি খাতে নেতৃত্ব দেওয়া প্যাসিফিক জিন্স চট্টগ্রামেরও শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রতিষ্ঠান।

সর্বশেষ অর্থবছরেও এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ছয় কোটি পিস জিন্স রপ্তানি করেছে। জিন্সের পাশাপাশি নিট ও কাজের পোশাকও (ওয়ার্কওয়্যার) রপ্তানি করে তারা। টানা সাতটি স্বর্ণপদকসহ ২৪টি জাতীয় রপ্তানি পুরস্কার, তিনবার এইচএসবিসি বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটির সব কারখানা একযোগে বন্ধ ঘোষণা করায় একদিনেই বেকার হয়ে গেছে ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। বিশ্বখ্যাত ১৪-১৫টি ব্র্যান্ডের জিন্স তৈরি করা প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের এমন পরিণতি দেখে হতাশ ও বিস্মিত শিল্প উদ্যোক্তারা। কারণ, প্রতিষ্ঠার পর এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটেছে এই গ্রুপে। চট্টগ্রামের গার্মেন্টস সেক্টরেও এমন ঘটনা প্রথম বলে মন্তব্য করেন বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব। বর্তমানে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার কোটি টাকা। তাদের কোনো ব্যাংকঋণ নেই। মুনাফা থেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানকে এমনই এক অনন্য উচ্চতায় রেখে গেছেন প্রয়াত শিল্পপতি নাসির উদ্দিন। সেটিকে দক্ষ হাতে এগিয়ে নিচ্ছিলেন তাঁর তিন সন্তান।

৪২ বছরের সাধনায় একটি থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯-এ। চালু হওয়া তাদের সাত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টিই পেয়েছে পরিবেশবান্ধব সনদ। কারখানাগুলো হচ্ছে– প্যাসিফিক জিন্স, জিন্স ২০০০, ইউনিভার্সেল জিন্স, এনএইচটি ফ্যাশন, প্যাসিফিক ক্যাজুয়াল ও প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার। এর পরও গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে অন্তত পাঁচ দফা প্যাসিফিক জিন্সের কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। লিপ্ত হয় মারামারিতে। বেজাসহ দায়িত্বশীল কোনো পক্ষই এই অসন্তোষ নিরসনে নেয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। যার ফলে গত বৃহস্পতিবার প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরের সই করা পৃথক আটটি বিজ্ঞপ্তিতে কারখানা বন্ধের তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কারখানার মধ্যে কিছু শ্রমিক কাজে যোগদান না করে কারখানার ভেতরে মারামারি, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। এতে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘কিছু শ্রমিক অবৈধভাবে কাজ বন্ধ করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করে। মারামারি ও ভাঙচুরে কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা আহত হন এবং প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

এটি অবৈধ ধর্মঘটের শামিল। এ অবস্থায় শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো।’ চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকায় প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের সাতটি কারখানা রয়েছে। সেগুলো হলো– প্যাসিফিক জিন্স, জিন্স ২০০০, ইউনিভার্সেল জিন্স, এনএইচটি ফ্যাশন, প্যাসিফিক এক্সেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার ও প্যাসিফিক অ্যাটায়ার্স। এর মধ্যে প্যাসিফিক জিন্সের ইউনিট দুটি ও ইউনিভার্সেল জিন্সের ইউনিট চারটি। পুলিশ জানায়, শ্রম আইনের ১৩ (ক) ধারা অনুযায়ী, কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, বেআইনি ধর্মঘটের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক চাইলে কারখানা বন্ধ করে দিতে পারবেন। যতদিন বন্ধ থাকবে, শ্রমিকরা তত দিন কোনো বেতন পাবেন না।

শ্রমিকদের সংঘর্ষ ঘিরেই কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। সাত কারখানায় মোট শ্রমিক ছিল ৩৫ হাজারের বেশি। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘২০২৪ সালের একটি মামলা ঘিরে কিছু শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। এটি মারাত্মক আকার ধারণ করায় মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। আমরা সেই বিজ্ঞপ্তির চিঠি পেয়েছি। এখানে বাইরে থেকে কেউ শ্রমিকদের কোনো ইন্ধন দিচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখছি আমরা।’

অথচ ২০২৮ সালের মধ্যে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ তাদের রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল বলে ইতিপূর্বে সমকালকে জানিয়েছিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে পানির অপচয় ৮০ শতাংশ হ্রাস করেছি। বর্তমানে আমাদের চাহিদার মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেটিকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। ওই বছরের মধ্যেই কার্বন নিঃসরণ ৬৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি আমরা।’ কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন হোঁচট খেয়েছে এখন। তাই একযোগে সাতটি কারখানা বন্ধের নোটিশ দিতে হয়েছে সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরকে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles