আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে আর কোনো ঋণের কিস্তি দেওয়া হবে না। সংস্থাটি বলেছে, নতুন সরকার গঠনের পরই তারা পরবর্তী আলোচনায় বসবে এবং নিশ্চিত হবে যে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে কি না। এই কিস্তির পরিমাণ প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার।
এই বার্তাটি দেওয়া হয় সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক–আইএমএফ বার্ষিক বৈঠকে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মন্সুর আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ডিসেম্বরে কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল
বৈঠকে ড. মন্সুর জানান, ষষ্ঠ কিস্তিটি মূলত ডিসেম্বরেই পাওয়ার কথা ছিল, জাতীয় নির্বাচনের আগে। তিনি যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশ যদি নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে পারে, তাহলে আইএমএফের উচিত নির্ধারিত সময়েই অর্থ ছাড় করা।
কিন্তু আইএমএফ কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন, যেহেতু ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা এবং তার পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাই সংস্থাটি আগে নতুন প্রশাসনের অবস্থান জানতে চায়। তারা নিশ্চিত হতে চায় যে, সংস্কার ও শর্তগুলো অব্যাহত থাকবে কি না।
গভর্নরের দাবি—ঋণ না এলেও সমস্যা নেই
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গভর্নর ড. মন্সুর বলেন, “আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো অবস্থায় আছে। ডলারের সংকট নেই। তাই আইএমএফের টাকা না এলেও বড় কোনো সমস্যা হবে না। তবে তাদের নীতিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, “এই কর্মসূচিতে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। দেশের অর্থনৈতিক সূচক এখন অনেক উন্নত।”
অর্থনীতিবিদদের মত—চাপ সৃষ্টি করছে আইএমএফ
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফ এই সময়টিকে ব্যবহার করছে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য। কারণ নির্বাচনের সময় অনেক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। সংস্থাটি চায় নতুন সরকার সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিক।
প্রাক্তন গভর্নর ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশ এখন আর কঠোর শর্ত মেনে ঋণ নিতে রাজি নয়। আমাদের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তাই অতিরিক্ত শর্ত মানা এখন সম্ভব নয়।”
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইএমএফের বার্তা
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন-পূর্ব এই সময়টিতে ঋণ বিলম্বের ঘোষণা রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। এটি এমন একটি ইঙ্গিত হতে পারে যে, বাংলাদেশ আইএমএফের নির্ধারিত সংস্কার শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। এর ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আইএমএফ তাদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করবে। যদি নতুন সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতেও কিস্তি আটকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকায় আসছে আইএমএফ মিশন
আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকা সফরে আসছে। তারা দুই সপ্তাহ অবস্থান করবে এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে। এরপর দলটি তাদের প্রতিবেদন ওয়াশিংটনের মূল দপ্তরে জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
আইএমএফের সহায়তা কর্মসূচির পটভূমি
২০২২ সালের শেষ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের কাছে আর্থিক সহায়তা চায়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। পরে আরও ৮০০ মিলিয়ন ডলার যোগ করা হয়, ফলে মোট ঋণ প্যাকেজ দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ দফায় মোট ৩.৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। এর বিপরীতে আইএমএফ সরকারকে কর ব্যবস্থা সংস্কার, ভর্তুকি কমানো, মুদ্রানীতি আধুনিকীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই শর্তগুলো পূরণে আংশিক অগ্রগতি অর্জন করলেও রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনও বড় বাধা হয়ে আছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
আইএমএফের এই বিলম্বের ফলে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ তেমন না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কারণ আইএমএফের ঋণ কেবল অর্থের উৎস নয়, এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে একটি নীতিগত নিশ্চয়তা হিসেবেও কাজ করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি নতুন সরকার আইএমএফের সংস্কার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেয় এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতিমালা অনুসরণ করে, তাহলে আগামী বছরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পেতে পারে।

