“কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না”— দিল্লিতে নির্বাসিত অবস্থায় শেখ হাসিনার এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার আর্তি।
২০২৪ সালের অগাস্টে সামরিক ও ইসলামপন্থী সমর্থনে ক্ষমতা দখল করে নেয় নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার। শুরুতে তারা বলেছিল, দেশে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ করবে। বাস্তবে ঘটেছে তার ঠিক উল্টো—বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভয়, নিপীড়ন আর মিথ্যা অভিযোগের এক অচল রাষ্ট্রে।
দমন-পীড়নের রাজনীতি
ইউনুস সরকারের আমলে প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থা—সবকিছুতে নেমে এসেছে দমননীতির ছায়া। হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের চাকরি হারাতে হয়েছে বা কারাগারে যেতে হয়েছে। অনেকের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

গ্রামেগঞ্জে “নাগরিক কমিটি” নামে গঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছে, দোকানপাট লুট করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই এসব ঘটনা ঘটছে, কিন্তু বিচার নেই।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আটক ব্যক্তিদের ওপর চলছে নির্যাতন, গুম এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়। যে সরকার নিজেকে “অন্তর্বর্তীকালীন” বলে পরিচয় দেয়, তারা কার্যত একটি পুলিশ রাষ্ট্রে রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক দলবন্দি নিষেধাজ্ঞা
সব রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আর পরে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত—বাংলাদেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে বাদ দিয়ে কোনো সরকারই জনগণের প্রতিনিধি দাবি করতে পারে না।
এই নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশের কোটি মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সমান। ইউনুস প্রশাসনের যুক্তি, “জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে” এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নিরাপত্তার অজুহাতই গণতন্ত্র ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতি ও সমাজে অস্থিরতা
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে অর্থনীতি ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়েছে। রপ্তানি কমেছে, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, টাকার মান পড়ে গেছে। একসময় যে বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল ছিল, এখন সেখানে শিল্প কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বিদ্যুৎ ঘাটতি, খাদ্যদ্রব্যের দামবৃদ্ধি ও দুর্নীতি এক ভয়াবহ চক্র তৈরি করেছে। আর এই সময়েই ইউনুস সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ।
বিচার ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যা একসময় মুক্তিযুদ্ধের ন্যায়বিচারের প্রতীক ছিল, এখন পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের আদালতে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে চলছে একতরফা বিচার, যেখানে সাক্ষ্য প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিশ্বের অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এই বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এতে শুধু শেখ হাসিনা নয়, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শেখ হাসিনার বার্তা—গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও
দিল্লিতে নির্বাসিত অবস্থায় শেখ হাসিনা এখনও দৃঢ় কণ্ঠে বলছেন, “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংবিধান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ওপর। কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনো সরকার টিকতে পারে না।”
তার এই আহ্বান ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি নৈতিক অবস্থান—যে দেশে জনগণের কণ্ঠস্বর বন্ধ করা হয়, সে দেশ দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা উন্নয়ন পায় না।
শেখ হাসিনার দাবি, “অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই পারে বাংলাদেশকে আবার গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনতে।”
আগামীর পথ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর—তারা কি জনগণের দাবি মেনে রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে, নাকি জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে?
দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন চারটি মৌলিক পদক্ষেপ:
১. সব নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
২. আওয়ামী লীগের নিবন্ধন পুনর্বহাল করা।
৩. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
৪. রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্যাতন বন্ধ করা।
এই চারটি শর্ত পূরণ না হলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে শুধুই এক প্রহসন—গণতন্ত্র নয়, স্বৈরাচারের পুনর্জন্ম।
লেখক: দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সম্পাদক, দি ভয়েস

