ইসলামপন্থীদের চাপে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষকের পদ বাতিল

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা নীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করেছে, যা গত আগস্টে নতুন নিয়োগবিধির মাধ্যমে চালু হয়েছিল।

রোববার প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগবিধি ২০২৫-এর সংশোধিত সংস্করণে এই দুই পদ বাদ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত এমন সময় এল যখন ইসলামপন্থী কয়েকটি সংগঠন সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল।

ধর্মীয় চাপের পর নীতির পরিবর্তন

মন্ত্রণালয়ের স্কুল বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাসুদ আখতার খান দ্য ভয়েস-কে নিশ্চিত করেছেন, “আগস্টের নিয়মে চারটি পদ ছিল—প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক (সাধারণ), সহকারী শিক্ষক (সংগীত) এবং সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা)। নতুন সংশোধনে কেবল দুটি পদ রাখা হয়েছে—প্রধান শিক্ষক ও সাধারণ সহকারী শিক্ষক।”

ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামি ও খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠন সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একযোগে বিবৃতি দেয়। ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেছিলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শেখানো ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী। সরকার বরং ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করুক।”

নিয়োগবিধিতে ভাষাগত সংশোধনও

দুইটি পদ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি সরকার নিয়োগবিধির ভাষাগত একটি ত্রুটি সংশোধন করেছে। আগের নিয়মে বলা হয়েছিল, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগকৃত ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞানে স্নাতক এবং বাকি ৮০ শতাংশ ‘অন্যান্য বিষয়ে’ স্নাতকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু নতুন সংশোধনে “অন্যান্য বিষয়ে” শব্দগুচ্ছের পরিবর্তে “বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে” রাখা হয়েছে, যাতে বিজ্ঞান ও অ-বিজ্ঞান—দুই বিভাগ থেকেই আবেদন করা যায়।

শিক্ষা মহলে উদ্বেগ

শিক্ষা বিশ্লেষক ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক বাদ দেওয়া হলে প্রাথমিক শিক্ষার সৃজনশীলতা ও মানবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংগীত ও ক্রীড়া শিক্ষা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে অপরিহার্য উপাদান বলে তারা মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষাবিদ বলেন, “এটা কোনো শিক্ষাগত সংস্কার নয়, এটা আদর্শগত আপস। সরকার সাময়িকভাবে ধর্মীয় চাপ থেকে বাঁচতে গিয়ে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের দরজা বন্ধ করছে।”

আদর্শ বনাম আপস

২০২৫ সালের নিয়োগবিধি মূলত জাতীয় শিক্ষা নীতি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4)–এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত হয়েছিল, যেখানে সাংস্কৃতিক ও শারীরিক শিক্ষাকে প্রাথমিক পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে সংযোজনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ধর্মীয় আপত্তির পর সরকার যে পিছু হটল, তা শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেই সামনে আনছে।

শিক্ষা পর্যবেক্ষকদের মতে, “এটি কেবল একটি পদ বাতিল নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোর আদর্শগত দিকনির্দেশনাকে পরিবর্তন করছে।”

সামনে কী অপেক্ষা করছে

নতুন বিধি অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া চলবে, তবে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা এখন পাঠ্যসূচিতে কতটা প্রাধান্য পাবে তা অনিশ্চিত। শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ শিক্ষকরা এসব বিষয় সাময়িকভাবে পড়াবেন, যদিও এতে মান বজায় রাখা কঠিন হবে।

শিক্ষা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই নীতিগত পিছুটান বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু আরও একমুখী করবে না, বরং শিশুদের সৃজনশীলতা ও শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনবে।

spot_img