পাকিস্তান থেকে ‘পাখির খাদ্য’ আড়ালে এসেছে ২৫ টন নিষিদ্ধ পপি বীজ

 

পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত ‘পাখির খাদ্য’ ঘোষণায় আনা দুইটি কনটেইনারে প্রায় ২৫ টন নিষিদ্ধ পপি বীজ (পোস্তদানা) জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করেছে কাস্টমসের অডিট, তদন্ত ও গবেষণা (এআইআর) শাখা। জব্দ করা পপি বীজের আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।

ঘোষণায় ছিল পাখির খাদ্য, ভেতরে লুকানো মাদকজাত বীজ

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, মেসার্স আদিব ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান থেকে ৩২ হাজার ১০ কেজি পাখির খাদ্য আমদানির ঘোষণা দেয়। চালানটি ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় এবং পরে খালাসের জন্য সাবের আহমেদ টিম্বার কোম্পানি লিমিটেডের অফডক ডিপোতে নেওয়া হয়।

খালাসের প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২২ অক্টোবর কাস্টমস কর্মকর্তারা কনটেইনার দুটি খুলে পরিদর্শন করেন। তাতে দেখা যায়, সামনের সারিতে রাখা ৭ হাজার ২০০ কেজি পাখির খাদ্যের পেছনে লুকানো ছিল ২৪ হাজার ৯৬০ কেজি পপি বীজ।

পরীক্ষায় নিশ্চিত নিষিদ্ধ পণ্য

পণ্যগুলো আসলেই পপি বীজ কি না তা যাচাই করতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নমুনা পাঠায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজি সেন্টার, এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট)। তিন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফলাফলে নিশ্চিত করা হয়—চালানটিতে থাকা বীজ পপি বীজ, যা ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ‘ক’ শ্রেণির মাদকদ্রব্য।

আমদানি নিষিদ্ধ, তবুও চাতুরীর আশ্রয়

চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপ-কমিশনার এইচ এম কবির জানান, আমদানিকারকরা কনটেইনারের সামনের দিকে পাখির খাদ্যের বস্তা সাজিয়ে রেখে ভেতরে নিষিদ্ধ পপি বীজ লুকিয়ে রাখেন।

তিনি বলেন, “পপি বীজ স্থানীয়ভাবে ‘পোস্তদানা’ নামে পরিচিত এবং কিছু দেশে এটি মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতি আদেশের ৩(১)(খ) ধারা ও ক্রমিক নং ১৫ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”

এইচ এম কবির আরও বলেন, “আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের মূল্য ৩০ লাখ টাকা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে এর বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঘটনায় কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”

পাকিস্তান থেকে মাদক চোরাচালানের নতুন রুট?

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তান থেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আসা কিছু বাণিজ্যিক চালানের প্রতি এখন বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য পাচারের নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবসায়ীরা ‘নিরীহ পণ্য’ বা ‘খাদ্যশস্য’ ঘোষণার আড়ালে নিষিদ্ধ পণ্য লুকিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

একজন কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, “পপি বীজ আপাতদৃষ্টিতে কৃষিজ পণ্য মনে হলেও এটি মাদক তৈরির মূল উপাদান। ফলে এর অঙ্কুরোদ্গমযোগ্য অবস্থায় আমদানি করা বা দেশে প্রবেশ করানো পুরোপুরি অপরাধ।”

কঠোর নজরদারিতে কাস্টমস

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি’ ও ‘অবৈধ পণ্যের আড়াল’—এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। তাই এখন থেকে বন্দরনির্ভর চালানের ওপর ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ইন্টেলিজেন্স-শেয়ারিং ও কনটেইনার স্ক্যানিং জোরদার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কাস্টমস ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় শুরু করেছে, যাতে সীমান্ত পেরিয়ে মাদক পাচার ও অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা যায়।

অর্থনৈতিক ও আইনি প্রভাব

বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে চালানটির মতো ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি করে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। তারা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনার পেছনে সংগঠিত অপরাধচক্র কাজ করছে, যারা আঞ্চলিকভাবে মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটিতে জড়িত আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, এবং প্রয়োজন হলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

কঠোর অবস্থান

উপ-কমিশনার এইচ এম কবির বলেন, “বাংলাদেশ কাস্টমস জনস্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। কোনোভাবেই অবৈধ বা নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি সহ্য করা হবে না।”

চট্টগ্রাম বন্দরে এই বিপুল পপি বীজ জব্দের ঘটনায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। এটি শুধু একটি বড় অর্থনৈতিক অপরাধ প্রতিরোধের উদাহরণই নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগে সংস্থাটির কঠোর মনোভাবের প্রতিফলন।

spot_img