সরকারি চালের মজুত বাড়াতে আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ সরকার আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের (ডিজি ফুড) এই উদ্যোগ মূলত দেশীয় বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা ও সরকারি গুদামে মজুত শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ নভেম্বর। এর আগে ১৩ নভেম্বর আরেকটি ৫০ হাজার টনের দরপত্র শেষ হবে এবং ৩ নভেম্বর আরেকটি দরপত্রের সময়সীমা শেষ হয়েছে।

শর্ত ও সরবরাহ সময়সীমা

দরপত্রে নন-বাসমতি পারবয়েল্ড (সেদ্ধ চাল) আমদানি চাওয়া হয়েছে সিআইএফ লাইনার-আউট শর্তে, অর্থাৎ চাল সরবরাহের খরচ, বিমা ও বন্দরে আনলোডিং খরচ বিক্রেতার দায়িত্বে থাকবে। সরবরাহ করতে হবে চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দরে, এবং চুক্তি অনুমোদনের ৪০ দিনের মধ্যে চাল পৌঁছে দিতে হবে। দরদাতাদের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্য প্রস্তাব কার্যকর রাখতে হবে।

চালের দাম ও মজুতের বাস্তবতা

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে চালের দাম গত এক বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যদিও উৎপাদন ভালো ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পাইকারি মজুতদারদের প্রভাব এবং বাজারে অস্বচ্ছতা দাম বাড়ার অন্যতম কারণ।

চাল বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য; এর দামের ওঠানামা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করছে, যা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামে প্রায় ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত আছে, যা ১৫ লাখ টনের স্বাচ্ছন্দ্য মাত্রার চেয়ে কম। তাই সরকার এখন একের পর এক আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে, যেন ভবিষ্যতের সংকট এড়ানো যায়।

বৈশ্বিক বাজারে চালের সংকট

বিশ্ববাজারে চালের দাম গত এক বছর ধরে ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রধান কারণ ভারতের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি, যা ২০২৩ সালে চালু হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারত নন-বাসমতি সাদা চালের রপ্তানি সীমিত করার পর থেকেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সেই ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎস খুঁজছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করেছে। এছাড়া কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে আমদানিচুক্তি করার কথাও চলছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও খাদ্য নিরাপত্তা

একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আমদানি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকোচন সরকারের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, রিজার্ভ এখন ১৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে, যা ২০২১ সালের তুলনায় অর্ধেক।

তবুও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, “জনগণের খাদ্য নিরাপত্তাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রয়োজনে আমদানি বাড়ানো হবে, যেন বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।”

আগামীর দিকনির্দেশনা

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল বিদেশ থেকে চাল কেনায় নির্ভর করলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকিতে পড়বে। তারা স্থানীয় কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

বিশ্ববাজারের বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি নভেম্বরের দরপত্রগুলো বাংলাদেশের খাদ্যনীতি ও ভবিষ্যৎ বাজার-স্থিতিশীলতার দিক নির্ধারণ করবে। নির্বাচনের আগে জনগণের প্রত্যাশা মেটাতে সরকার চালের সরবরাহে ঘাটতি রাখতে চাইছে না।

spot_img