বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়ে ইরানে বন্দী ব্রিটিশ দম্পতির মুক্তি দাবি

লিন্ডসে ও ক্রেইগ ফোরম্যানকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করেছে ইরান। পরিবার বলছে, তাঁরা ভয়াবহ অবস্থায় আছে; দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ব্রিটিশ দম্পতি লিন্ডসে ও ক্রেইগ ফোরম্যান মোটরসাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানের পুলিশ তাঁদের আটক করে। পরবর্তীতে “গুপ্তচরবৃত্তির” অভিযোগে মামলা করে।

তখন থেকে ইরানের জেলে বন্দী তারা। অভিযোগ উঠেছে, ভয়াবহ ও অমানবিক পরিবেশে তাঁদের বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে তাঁদের শারীরিক অবস্থা। পরিবার বলছে, দম্পতির জীবন এখন হুমকির মুখে, অথচ ব্রিটিশ সরকার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

লিন্ডসে ও ক্রেইগ ফোরম্যানের পরিবার তাদের বিরুদ্ধে করা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে। গভীর উদ্বেগের রয়েছে তাঁদের পরিবার ও প্রিয়জনরা।

ভোগান্তি ও অসুস্থতা

লিন্ডসের ছেলে জো বেনেট জানিয়েছেন, কারাগারের কক্ষে কোনো বিছানা বা গদি নেই। বাবা-মা দুজনেই অপুষ্টি ও নানা ধরনের রোগে ভুগছেন। তিনি বলেন, “তাঁরা মানসিকভাবে শক্ত হলেও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। আমার সৎ বাবা মাসের পর মাস দাঁতের ফোঁড়ায় ভুগছেন। মা’কে কয়েকদিন আগে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে শুনে আমি ভেঙে পড়েছি। জানি না তিনি আদৌ ভালো আছেন কি না।”

জো আরও বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে সরাসরি যোগাযোগ নেই। মাত্র একবার ফোনে কথা বলতে পেরেছেন। “এমন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়া খুব কঠিন,” তিনি বলেন।

বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা

সম্প্রতি তেহরানের একটি আদালতে শুনানির পর পরিবার আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মকর্তাকে আদালতে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁদের আইনজীবীকে একাধিক ভুল অনুবাদ সংশোধন করতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ন্যায়বিচার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

পরিবার আশঙ্কা করছে, খুব শিগগিরই রায় ঘোষণা হতে পারে এবং তা তাঁদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া

৩৫ জন এমপি ও সংসদের অল-পার্টি গ্রুপ ফর আর্বিট্রারি ডিটেনশন অ্যান্ড হোস্টেজ অ্যাফেয়ার্স যৌথভাবে চিঠি দিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কুপার অক্টোবর মাসে ফোরম্যান পরিবারের সঙ্গে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে জো বেনেট বলছেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। “আমরা আর দেরি করার সুযোগ নেই। যুক্তরাজ্য সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।”

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, “ক্রেইগ ও লিন্ডসে ফোরম্যানকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি এবং পরিবারকে সহায়তা প্রদান করছি।”

পুরোনো দৃষ্টান্ত

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক নাজানিন জাঘারি-র‌্যাটক্লিফকে ২০১৬ সালে একইভাবে আটক করে দীর্ঘ ছয় বছর বন্দি রাখা হয়েছিল। পরে ব্রিটেন-ইরান অর্থনৈতিক বিরোধ মেটানোর পর তিনি মুক্তি পান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে বলে “হোস্টেজ ডিপ্লোম্যাসি”— অর্থাৎ রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে বিদেশিদের আটক রাখা।

পরিবারের আহ্বান

“আমার মা ও সৎ বাবা ভুয়া অভিযোগে বন্দি। তাঁরা ভয়াবহ পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন। আমরা অসহায় বোধ করছি,” বলেন জো বেনেট।

পরিবারের পক্ষ থেকে আবারও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে লিন্ডসে ও ক্রেইগকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles