বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে পক্ষপাতের অভিযোগ

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আন্দোলন নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের (OHCHR) প্রতিবেদনকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ও তথ্যগতভাবে দুর্বল বলছে কানাডার একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক।

বাংলাদেশে গত বছরের সহিংস আন্দোলন নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তা নিয়ে এবার সামনে এলো তীব্র সমালোচনা। কানাডাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (জিসিডিজি) অভিযোগ করেছে, এ প্রতিবেদন ছিল “পক্ষপাতদুষ্ট, পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।”

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মাসে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। সেখানে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মত প্রকাশে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

কিন্তু জিসিডিজি’র মতে, ওই প্রতিবেদনে শুধু সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তার সহযোগী রাজনৈতিক ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ডকে আড়াল করা হয়েছে।

সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন

জাতিসংঘ সংস্থার প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময়সীমার ভেতরে সংঘটিত ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার পর ৫ আগস্ট থেকে সারাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর ব্যাপক হামলা হয়।

জিসিডিজি বলছে, এই সময়কাল বাদ দেওয়ার মাধ্যমে মূলত সাবেক সরকারের দায়কে বড় করে দেখানো হয়েছে এবং নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংঘটিত সহিংসতাকে পাশ কাটানো হয়েছে।

প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা

কানাডার সংস্থাটির অভিযোগ, জাতিসংঘ দলটি প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা দেখিয়েছে।

  • ১১ হাজারের বেশি হতাহতের দাবি থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৯ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
  • সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
  • প্রমাণের মানদণ্ড হিসেবে “বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ” (reasonable grounds to believe) ব্যবহার করা হয়েছে, যা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
  • প্রতিবেদন প্রকাশের আগে খসড়া কপি অন্তর্বর্তী সরকারকে দেখানো হয়, ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।

দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ

জিসিডিজি আরও অভিযোগ করে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদন সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” পর্যন্ত উল্লেখ করেছে, অথচ বিরোধীদলীয় কর্মীদের সহিংসতাকে “প্রতিশোধমূলক” বা “আকস্মিক” আখ্যা দিয়েছে। এতে এক ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হয়েছে।

আইনি প্রভাব

প্রতিবেদনটির প্রভাব ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় পড়তে শুরু করেছে। গত আগস্টে বাংলাদেশের হাইকোর্ট এই প্রতিবেদনকে “ঐতিহাসিক দলিল” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং চলমান মামলাগুলোতে এটি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এতে করে একটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত নথিকে বিচারিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রভাব

জিসিডিজি প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এ তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করে, ইউনুস জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভল্কার টুর্কের সঙ্গে দাভোসে বৈঠক করেছিলেন, প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে।

এসব কারণে আন্তর্জাতিক মহলে এ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জিসিডিজি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ যদি সর্বজনীনতা ও পদ্ধতিগত কঠোরতা মেনে না চলে, তবে এগুলো ন্যায়বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

spot_img