বাংলাদেশে শরৎ আসলেই দুর্গাপূজা ঘিরে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। সোনালি শাড়ি, আলপনা আঁকা প্যান্ডেল, ধুপ-ধুনো আর ঢাকের বাজনা—সব মিলিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবটি যেন আনন্দের রঙে রাঙিয়ে তোলে চারপাশ।
রাজধানী ঢাকায় ঢাকেশ্বরী, শাঁখারিবাজার, গুলশান, বনানী কিংবা ওয়ারির পূজা মণ্ডপে হাজারো ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড় প্রমাণ করে, পূজা এখন শুধু আচার নয়, এটি একটি সমবেত উৎসব।
তবে ভক্তিময় আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর উৎকণ্ঠা। দেশের হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য পূজা মানে যেমন ভক্তি, তেমনি আতঙ্কও—গত কয়েক বছরের সহিংসতার স্মৃতি যে এখনো তাজা।
সহিংসতার স্মৃতি
২০২১ সালে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে একযোগে পঞ্চাশেরও বেশি মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সংখ্যা বেড়ে যায় নাটকীয়ভাবে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর অন্তত ২,৪০০টি হামলা হয়েছে। কেবল আগস্ট ২০২৪-এর প্রথম ১৬ দিনেই ২,০১০টি সহিংস ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়।
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় কয়েক মাস আগেই সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতেই শত শত বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সুনামগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু গ্রামগুলিতে তাণ্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভুক্তভোগী কৃষক কৃষ্ণ দাস তখন বলেছিলেন, “তারা জানালা-দরজা ভেঙে দিল, আসবাবপত্র ভাঙল, এমনকি হাঁড়ি-পাতিলও নিয়ে গেল।”
উৎসব ও নিরাপত্তা
এ বছর প্রায় ৩১ হাজার পূজা মণ্ডপে পূজা হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানিয়েছেন, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েকটি মামলাও হয়েছে। তবে সম্প্রদায়ের মানুষ এসব আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছে না। ঢাকার মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব স্পষ্টই বলেছেন, “শুধু পাঁচ দিনের নিরাপত্তা চাই না, ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা চাই।”
জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে পূজার ঠিক আগেই একটি মন্দিরে সাতটি প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে শতবর্ষী কালীমন্দিরে অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয়েছে মন্দির ও প্রতিমা। এ ধরনের হামলাকে ‘ক্ষুদ্র ঘটনা’ বলে অবহেলা করলে ভুক্তভোগীদের আতঙ্ক আরও বাড়ে।
হিন্দু সংগঠনগুলোর দাবি
ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ‘যৌথ সনাতনী জাগরণ পরিষদ’ বেশ কয়েকটি দাবি তোলে:
- গ্রেপ্তার হওয়া সনাতনী নেতৃবৃন্দের নিঃশর্ত মুক্তি,
- দুর্গাপূজায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে সেনা মোতায়েন,
- তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা,
- সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সর্বক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি।
তাদের অভিযোগ, ধারাবাহিকভাবে হত্যা, লুটপাট, প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চলতে থাকলেও সরকারের পদক্ষেপ সীমিত থেকে যাচ্ছে “তদন্ত চলছে” ধরনের ঘোষণায়।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশে হিন্দু, আদিবাসী ও খ্রিস্টানদের ওপর হামলা পদ্ধতিগত রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের USCIRF-ও এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্টশিট প্রকাশ করেছে।
পাশাপাশি, নির্বাসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, “মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর যে বহুমুখী সহিংসতা চলছে, তা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।”
উৎসব নাকি অস্তিত্বের লড়াই?
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তবে প্রতিবার উৎসব ঘনিয়ে এলেই একই প্রশ্ন জেগে ওঠে—প্রতিমা পূজা শেষে ঘরে ফেরা কি নিরাপদ হবে?
মহিষাসুরবধের প্রতীকী কাহিনি আজ বাস্তবতার রূপ পেয়েছে—হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে আজকের বড় প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি দুর্বলদের রক্ষা করবে, নাকি চুপচাপ তাকিয়ে থাকবে?
অতএব, দুর্গাপূজা আজ শুধু আনন্দ নয়, এটি সংখ্যালঘুদের বাঁচার লড়াই, তাদের নাগরিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামও।

