খাগড়াছড়িতে ধর্ষণকে ঘিরে সহিংসতা: ৩ আদিবাসীর মৃত্যু, শতাধিক দোকান ভস্মীভূত

গুইমারায় প্রতিবাদে গুলি ও অগ্নিসংযোগ, পাহাড়ি জনপদে ১৪৪ ধারা জারি; ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি

খাগড়াছড়ি, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এক কিশোরী মারমা মেয়েকে ধর্ষণের প্রতিবাদে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দ্রুত রূপ নেয় ভয়াবহ সহিংসতায়।

গুইমারা উপজেলার রামেসু বাজারে রোববার দুপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনজন আদিবাসী যুবক। আহত হয়েছেন ডজনাধিক মানুষ, যার মধ্যে সেনা ও পুলিশের সদস্যও রয়েছেন। এরপরই বাজারে শুরু হয় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, যেখানে প্রায় শতাধিক আদিবাসী মালিকানাধীন দোকান ও ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়।

ধ্বংসস্তূপে রামেসু বাজার

চোখের সামনে ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে ভেঙে পড়েছেন স্থানীয়রা। মারমা সম্প্রদায়ের এই বাজারটি ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মংসোয় চৌধুরী নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার নিজের বাড়িও আগুনে পুড়ে গেছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছে।”

একজন শিক্ষার্থী সানাও মারমা জানান, “আগুন দেওয়ার সময় আমরা পালিয়ে ছিলাম। ফিরে এসে দেখি সব দোকান জ্বলছে।”

গুলিতে তিনজনের মৃত্যু

রোববার দুপুরে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, প্রথমে কথাকাটাকাটি, পরে হঠাৎ গুলি ছোড়া শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজন যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ বলছে, গুলিতে তিনজন মারা গেছেন, তবে কার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পালাশ সাংবাদিকদের বলেন, “বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া এখন কিছু বলা সম্ভব নয়।” নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

সেনাবাহিনীর ভিন্ন দাবি

অন্যদিকে সেনাবাহিনী দাবি করছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া উগ্রপন্থী সংগঠন ইউপিডিএফ (UPDF) সদস্যরা পাহাড় থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। আইএসপিআর-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের সদস্যরা প্রথমে গুলি করেনি, বরং গুলিবর্ষণের শিকার হয়েছে। পরবর্তীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলে অস্ত্রধারীরা পাহাড়ে পালিয়ে যায়।”

তবে আদিবাসী নেতারা সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে হঠাৎই গুলি চালানো হয়, আর সুযোগে বহিরাগত বাঙালি দুষ্কৃতিকারীরা বাজারে অগ্নিসংযোগ করে।

ধর্ষণের ঘটনাই মূল সূত্রপাত

সমগ্র পরিস্থিতির সূত্রপাত গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সিংগিনালা এলাকায় টিউশনি শেষে বাড়ি ফেরার পথে ১২ বছরের এক মারমা স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন পুলিশ ১৯ বছরের শায়ন শীলকে গ্রেপ্তার করে, তবে তার দুই সহযোগী এখনো পলাতক।

এই ঘটনার পর থেকেই পাহাড়জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-যুবকদের নেতৃত্বে মানববন্ধন, মিছিল, ধর্মঘট ও অবরোধ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের ভাষায়, “বারবার আমাদের মা-বোনেরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, অথচ বিচার নেই।”

অবরোধ ও প্রশাসনের অবস্থান

শনিবার থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলছে। এতে যাতায়াত ও পর্যটন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশাসন শনিবার রাতেই ১৪৪ ধারা জারি করে এবং অতিরিক্ত সেনা ও বিজিবি মোতায়েন করে। জেলা প্রশাসক এ.বি.এম. ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেন, “আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সকল পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”

মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং নারী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে। তাদের মতে, যদি ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হতো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে এমন রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, পাহাড়ে এ ধরনের সহিংসতা নতুন নয়। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, সামরিক উপস্থিতি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস আজও বিরাজ করছে। গত বছরও সেপ্টেম্বর মাসে একইভাবে দাঙ্গায় প্রাণহানি হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের দাবি

জুম্ম ছাত্র জনতার পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে: ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার, নিহত পরিবারের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট পুনর্বাসন, গুলির ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত, আটক ছাত্র-যুবকদের মুক্তি এবং ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার।

সরকার এখনো এসব দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি। তবে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধর্ষণ মামলার ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হতে পারে।

spot_img