মলদোভার জাতীয় নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী পার্টি অব অ্যাকশন অ্যান্ড সলিডারিটি (PAS) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে দেশটি স্পষ্টভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখল, যদিও পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, ভুয়া প্রচারণা ও সহিংসতার আশঙ্কা ছড়িয়ে ছিল।
নির্বাচনের তাৎপর্য
মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু আগেই এই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী এই ছোট দেশটি একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে রাশিয়ার প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনীতির লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে। এবারের ভোটে মলদোভানদের সামনে ছিল দুটি পথ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা নাকি রাশিয়ার প্রভাববলয়ে ফিরে যাওয়া।
চূড়ান্ত ফলাফল
ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, PAS পেয়েছে ৫০.১৬ শতাংশ ভোট এবং সংসদের ১০১ আসনের মধ্যে ৫৫টি আসন নিশ্চিত করেছে। এর ফলে তারা এককভাবে সরকার গঠনের মতো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াপন্থী ‘প্যাট্রিয়টিক ইলেক্টোরাল ব্লক’ (BEP), যা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইগর দোদনের নেতৃত্বে ছিল, তারা মাত্র ২৪.১৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৬টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে বিকল্প ইউরোপপন্থী ‘অল্টারনেটিভ পার্টি’ ৮টি আসন পায়। আরও দুটি ছোট দল—‘আওয়ার পার্টি’ ও ‘ডেমোক্রেসি অ্যাট হোম’—প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করেছে।
রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ
নির্বাচনের আগে থেকেই মলদোভান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছিল, রাশিয়া ভোট প্রভাবিত করতে একধরনের “হাইব্রিড যুদ্ধ” চালাচ্ছে। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল সাইবার হামলা, বেআইনি অর্থায়ন, ভুয়া প্রচারণা এবং ভোট কেনাবেচা। দুটি রাশিয়াপন্থী দলকে শেষ মুহূর্তে বেআইনি অর্থায়নের কারণে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে অনলাইনে ভুয়া খবর, মন্তব্য ও প্রচারণা ছড়ানো হয়েছিল। গুগলও জানিয়েছে, তারা গত বছর জুন থেকে হাজারেরও বেশি ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করেছে, যেগুলো সমন্বিতভাবে মলদোভার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল।
সহিংসতার হুমকি
ভোটের দিন রাজধানী কিশিনাউ থেকে তিনজনকে দাঙ্গার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। আগের সপ্তাহেই ৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যাদের রাশিয়ার প্রশিক্ষণে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থিত প্রবাসী মলদোভানদের ভোটকেন্দ্রেও বোমা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবুও প্রায় ১৮ শতাংশ ভোট পড়েছে প্রবাসীদের কাছ থেকে, যা PAS-এর বিজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজয়ের প্রতিক্রিয়া
PAS নেতা ইগর গ্রোসু নির্বাচনী ফলাফলের পর সাংবাদিকদের বলেন, “এটি শুধু PAS-এর নয়, মলদোভার জনগণের বিজয়। রাশিয়া অর্থ, মিথ্যা ও বেআইনি পন্থায় আমাদের থামানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি।”
প্রধানমন্ত্রী ডোরিন রিচানও বলেন, “মলদোভানরা প্রমাণ করেছে তাদের স্বাধীনতা অমূল্য। সেটি কেনা যায় না, ভুয়া প্রচারণায় নষ্ট করা যায় না।”
রাশিয়াপন্থীদের প্রতিবাদ
অন্যদিকে ইগর দোদন এই ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, PAS ভোট কারচুপি করেছে এবং জনগণের প্রকৃত রায়কে অস্বীকার করেছে। তার সমর্থকরা সোমবার সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভও করেছেন।
সামনে কী?
প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু শিগগিরই নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রিচানই পুনর্নিযুক্ত হবেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির পথে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেশটি গভীর বিভক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এই নির্বাচন শুধু মলদোভার নয়, বরং সমগ্র ইউরোপের জন্য একটি বার্তা—রাশিয়ার প্রচণ্ড চাপ ও প্রভাব সত্ত্বেও ছোট এই দেশটি ইউরোপীয় ভবিষ্যতের পথ বেছে নিয়েছে।

