গত ১৩ মাসে অন্তত ৪৪ হাজার ৪৭২ মানুষকে আওয়মী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে শান্তিতে নোবেল জয়ী মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার।
ইসলামপন্থী ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতা দখল করা মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের সহযোগী ও কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলো এই তথ্য প্রকাশ করেছ।
এমন গণ-গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তারা “ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত”। তবে আওয়ামী নেতারা বলছেন, মুহাম্মদ ইউনুসের বর্তমান সরকারই ফ্যাসিবাদী, যারা ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করছে এবং আওয়ামী লীগ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিধনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
জামিনের অধিকারের বিরোধী!
সম্পূর্ণ পুলিশী প্রতিবেদন নির্ভর ঐ সংবাদের তথ্য অনুযায়ী বিগত এক বছরের অধিক সময় যাবত বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ হাজার ৩৭১ জন জামিন পেয়েছেন।
আদালত থেকে আওয়ামী লীগের লোকেরা কিভাবে জামিন পায়, তা নিয়েই প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হয়েছ। জামিন হওয়া ঠেকাতে কি করা উচিত, সে বিষয়ে সরকারের কর্মকর্তা ও সরকার সমর্থক মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য সেখানে ছাপানো হয়েছে। বলাবাহুল্য আওয়ামী লীগের বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় গ্রেপ্তারের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ব্যক্তিবর্গের কোনো বক্তব্য প্রথম আলো নেয়নি।
ইউনুস সরকার ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের বক্তব্য প্রচারকে মিডিয়ায় নিষিদ্ধ করেছে। কেবল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বলার অনুমতি আছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের বক্তব্য প্রকাশ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম এই পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দি ভয়েস–কে রবিবার বলেন, “রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষে আসল তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন “বায়বীয় মামলায়” তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। “আদালতকে স্বাভাবিক নিয়মে জামিন দিতে দেওয়া হচ্ছে না,” বলেন নাছিম। তার মতে, “জামিন পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, যা আদালত দেখবেন। কিন্তু আদালতকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়ার জন্যই ইউনুস সরকারের কর্তারা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন।”
তিনি আরও জানান, জামিন প্রতিহত করতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে ইউনুস সরকার। “আদালতের দায়িত্ব আজ কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
জামিনের বিরুদ্ধে সরকারি কমিটির বিষয়টি প্রথশ আলোর প্রতিবেদনেও উল্লেখ আছে। পত্রিকাটি লিখেছে, “১৪ সেপ্টেম্বরের সভায় জামিনের বিষয়টি তদারকির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে আইন মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং পুলিশের প্রতিনিধি থাকবেন। কমিটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কম সময়ের মধ্যে কীভাবে জামিন পাচ্ছেন, তা অনুসন্ধান করবে।”
জামিন নিয়ে যত উদ্বেগ
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রেপ্তার ও জামিন সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রায় ৭৩ শতাংশ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পুলিশ বলছে, এসব আসামির মধ্যে কেউ কেউ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলায় জড়িত, আবার কেউ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মিছিল ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যমতে, কেবল রাজধানীতেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর মিছিল ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৯৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১,১২৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০৩ জন জামিন পেয়েছেন।
প্রথম আলো জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বৈঠকগুলোতে হঠাৎ মিছিল ও ব্যাপক জামিন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ঝটিকা মিছিলের সময় ২৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশঙ্কা করছে, সামনে ঢাকায় আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, মন্ত্রণালয় ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে মাঠপর্যায়ের পুলিশ অনেক সময় পর্যাপ্ত প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আদালতে জামিন হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক নিরপরাধ মানুষকেও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে “ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত” বলে চালানো হচ্ছে।
“পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। জামিনের এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে আদালতের। প্রমাণাদি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পুলিশের ছোটখাটো কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। তবে বড় কোনো বিচ্যুতি নেই। এগুলোর বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সব সময় তদারকি করছেন।”
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সবাই সরকারপক্ষীয়
শুধুমাত্র সরকারপক্ষীয় লোকজনের বক্তব্য নিয়ে প্রথম আলো প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করলেও “মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা” বিচার না হওয়া পর্যন্ত জামিনে থাকার নাগরিক অধিকার অস্বীকার করতে পারেননি। তবে তারা জামিন ঠেকানোর জন্য বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধে জড়ালে সেই তথ্যগুলো সঠিকভাবে আদালতের নজরে আনাটা গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রথম আলো লিখেছে, জামিন ঠেকাতে “সঠিকভাবে মামলা দায়ের ও তদন্ত করা জরুরি।” বলেছে, “আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তিদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রে জামিন আবেদন নাকচ হচ্ছে। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কোনো কোনো ব্যক্তিকে জামিন না দেওয়া নিয়ে সমালোচনাও আছে। কারণ, যেসব হত্যা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেগুলোতে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা কঠিন।”
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেছেন, বেশির ভাগ আসামি সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। সরাসরি আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, এমন আসামির সংখ্যা খুবই কম। অন্য মামলাগুলোতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর আদালতে যেনতেনভাবে ‘ফরোয়ার্ডিং’ দেয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় অনেক আসামির দু-তিন মাসের মধ্যে জামিন হয়ে যায়।
আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত করে ইউনুসের নেতৃত্বাধিন বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করা এবং বর্তমান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে সক্রিয় থাকা মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনের বক্তব্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করেছে দৈনিক প্রথম আলো।
নূর খানও স্বীকার করেছেন, “গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোতে অনেক সাধারণ মানুষকে হয়রানিমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তিনি বলেছেন, “খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা জামিন পাবেন। প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। পুলিশ যে আইনে আসামিদের গ্রেপ্তার করছে, বিচারক যদি সেই আইনে জামিন দেওয়া যথাযথ মনে করেন, সেটিকে রহিত করার সুযোগ নেই।” জামিন ঠেকানোর জন্য “সঠিকভাবে মামলা দায়ের ও তদন্ত করা জরুরি” বলে তিনি মতামত দিয়েছেন।

