ইউনুসের অভিযোগ ভারতের প্রত্যাখ্যান; সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন প্রত্যাশা

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এড়িয়ে ভারত বলল—বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচন হতে হবে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু

ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুসের মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়কালে নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ইউনুস প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

ইউনুসের অভিযোগ

ইউনুস বলেন, “আমাদের ভারতের সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়েছে কারণ তারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে মেনে নেয়নি। তারা হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে—যিনি তরুণদের হত্যা করেছেন। এটাই দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার মূল কারণ।” তিনি আরও দাবি করেন, ভারত থেকে নানা ধরনের “ভুয়া সংবাদ” ছড়ানো হচ্ছে যে বাংলাদেশ এখন ইসলামপন্থীদের হাতে বা তালেবানদের প্রভাবে রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দেশটি গণহত্যার কারসাজির মূল ব্যক্তি মোহাম্মদ ইউনুস নিজে।  উগ্রমৌলবাদী ও ছাত্রদের সহিংস তৎপরতায় ঠেলে দিয়ে বহু পুলিশ এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করিয়েছেন শান্তিতে নোবেল জয়ী ইউনুস। সরকার পরিবর্তনের জন্য এর সবটাই “নিখুঁত পরিকল্পনার” মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে বলে ইউনুস প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।

তবে চলমান যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ইউনুস ভারতকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তোলেন—দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার। তিনি বলেন, সার্কের ধারণার জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশে এবং এ অঞ্চলের ব্যবসা, শিক্ষা, সংযোগ বাড়াতে এই প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এটি অচল হয়ে পড়েছে।

ভারতের পাল্টা জবাব

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণদীর জয়সওয়ালকে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ইউনুসের অভিযোগ নিয়ে পাল্টা বক্তব্য দেননি। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের আগের অবস্থান পুন:ব্যক্ত করে বলেন, “বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত সংসদ নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়—আমরা বারবার এ প্রত্যাশার কথা জানিয়েছি।”

হাসিনার ভারত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জয়সওয়াল কূটনৈতিকভাবে এড়িয়ে যান। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ভারতের উদ্বেগ রয়েছে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে। এর আগেও ভারত অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। ঢাকা অবশ্য এই অভিযোগকে বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের জবাব ছিল আরও কড়া। জয়সওয়াল পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট দেশ” সন্ত্রাসবাদকে মদদ দিয়ে সার্ককে অচল করে রেখেছে। ২০১৪ সালের পর আর কোনো সার্ক সম্মেলন হয়নি। ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে নির্ধারিত সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণ না করার পর ভেস্তে যায় পুরো বৈঠক। তখন ভারত ছাড়াও ভুটান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানও সরে দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রে ইউনুসের তৎপরতা

জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশাপাশি ইউনুস মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তিনি বিশেষভাবে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব তুলে ধরেন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের ওপর জোর দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সের্জিও গরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রসঙ্গ তোলেন।

অচলাবস্থায় সম্পর্ক

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অচলাবস্থা তৈরি হয়। ঢাকা এখন ভারতের বিরুদ্ধে নাক গলানোর অভিযোগ তুলছে, আর দিল্লি জোর দিচ্ছে গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার ওপর।

দুই দেশের মধ্যে আস্থাহীনতা যতই বাড়ছে, আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো সার্কও ততটাই স্থবির হয়ে পড়ছে। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এই দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন আরও বাড়বে কিনা, সেটিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলের মূল প্রশ্ন।

spot_img