পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, সেনা-বেসামরিক যৌথ শাসনই ‘হাইব্রিড মডেল’

খাজা আসিফ সমালোচনার মুখে পাকিস্তানের শাসন কাঠামোকে সমর্থন করে বলেছেন—এটি নিখুঁত গণতন্ত্র নয়, তবে বর্তমান বাস্তবতায় ‘প্রয়োজনীয়’।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন দেশের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করে।

তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের বর্তমান শাসন কাঠামো একটি “হাইব্রিড মডেল”, যেখানে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক নেতৃত্ব হাত মিলিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই ব্যবস্থায় আসল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই কেন্দ্রীভূত।

হাইব্রিড মডেল নিয়ে আসিফের ব্যাখ্যা

ব্রিটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক মেহেদী হাসানের এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, পাকিস্তানে আসলে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—নাগরিক সরকারের নাকি সেনাবাহিনীর?

হাসান বলেন, “অন্য দেশে সেনাপ্রধান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অধীন। কিন্তু পাকিস্তানে প্রতিরক্ষামন্ত্রীই সেনাপ্রধানের অধীনস্থ। জেনারেল আসিম মুনির তো আপনার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর।”

প্রশ্নের জবাবে আসিফ অস্বীকার করে বলেন, “না, এটা এভাবে নয়। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। সিদ্ধান্তগুলো হয় সমঝোতার ভিত্তিতে।” তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থায় সেনা ও বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্যের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা ও ‘ডিপ স্টেট’ মন্তব্য

সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে হাসান বলেন, “আমেরিকায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেলদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু পাকিস্তানে তা হয় না।” উত্তরে আসিফ মন্তব্য করেন, “ওদের মডেল ভিন্ন। ওখানে ‘ডিপ স্টেট’ আছে।”

এরপর হাসান পাল্টা বলেন, “কিন্তু অভিযোগ তো আপনার দেশেই—সেনা ও গোয়েন্দা মহলই ‘ডিপ স্টেট’। ওরাই নিয়ন্ত্রণ করছে সব।” এ প্রসঙ্গে আসিফ দোষ চাপান অতীতের সামরিক শাসকদের ওপর।

‘প্রয়োজনীয় বাস্তবতা’ হিসেবে হাইব্রিড শাসন

খাজা আসিফ এর আগেও একাধিকবার এই মডেলকে সমর্থন করেছেন। ডন পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই শাসনব্যবস্থা নিখুঁত গণতন্ত্র নয়, তবে পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি এক ধরনের “প্রয়োজনীয় বাস্তবতা”।

এই তথাকথিত হাইব্রিড সিস্টেমে বেসামরিক সরকার নির্বাচিত থাকলেও সেনাবাহিনী বড় ধরনের প্রভাব খাটায়—রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে।

হোয়াইট হাউসে যৌথ উপস্থিতি

এমন এক সময়েই ওয়াশিংটনে দেখা গেল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে একসঙ্গে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের স্বাগত জানান। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও উপস্থিত ছিলেন।

এই দৃশ্য পাকিস্তানের শাসন কাঠামোর বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তোলে—যেখানে বেসামরিক সরকার ও সেনাবাহিনী পাশাপাশি থাকলেও সেনাবাহিনীর প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন।

সমালোচনা ও বিতর্ক

পাকিস্তান বহুদিন ধরেই গণতন্ত্রের মানদণ্ডে বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশ। মানবাধিকার নিয়েও দেশটির রেকর্ড সমালোচিত। সমালোচকদের মতে, ‘হাইব্রিড মডেল’ কেবল সেনা প্রভাবকে বৈধতা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতা দুর্বল করছে। সমর্থকদের দাবি, এই মডেল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে।

খাজা আসিফের সর্বশেষ মন্তব্য আবারও প্রশ্ন তুলেছে—পাকিস্তানের ক্ষমতা আসলেই কি সমঝোতায় ভাগাভাগি হয়, নাকি সেনাবাহিনী এখনো দেশটির রাজনীতির প্রকৃত নিয়ন্ত্রক?

spot_img