জাতিসংঘ আবারও ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এক দশক আগে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো বহুল আলোচিত পারমাণবিক চুক্তির পর তুলে নেওয়া হয়েছিল।
এবার ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানকে পারমাণবিক চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ তোলার পর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগ উঠলে ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে হয়। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় নতুন করে নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হচ্ছে রবিবার মধ্যরাত ১২টা থেকে।
এ সিদ্ধান্ত ঠেকাতে চীন ও রাশিয়া ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব তুললেও নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে মাত্র ৪ জন সমর্থন দেয়।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা, ইরানের ব্যক্তিবিশেষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ জব্দ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, এমনকি ইরানের কার্গো বিমান ও জাহাজ তল্লাশির অনুমতিও দেওয়া হবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায়, অবিচার এবং বেআইনি” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে চায়নি এবং তারা এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর সদস্য। তবে ইসরায়েলের হামলা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ইরান স্বাভাবিকভাবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাতে পারবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে ধোঁকা দিয়েছে, আর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি (E3) সেটিকে কবর দিয়েছে।” তাঁর দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা সম্পূর্ণ অচলাবস্থায় রয়েছে।
পটভূমি ও জটিল বাস্তবতা
২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামা প্রশাসনের সময়ের JCPOA চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। সেই থেকে ইরান ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ কার্যক্রম চালু করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে।
চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। যদিও সম্প্রতি IAEA নিশ্চিত করেছে যে ইরানি স্থাপনাগুলোতে তাদের পরিদর্শন আবার শুরু হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন
ইরান জোর দিয়ে বলছে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে—বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার জন্য। তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। এর মধ্যেই রাশিয়া ইরানের সঙ্গে ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে, যাতে দক্ষিণ ইরানে চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন করে চাপানো নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থানকে আরও চাপে ফেলবে। এখন দেখার বিষয়—এই চাপ ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে সক্ষম হয় কি না, নাকি তেহরান আরও কট্টর অবস্থান নেয়।

