নিউইয়র্কে প্রবাসীদের বিক্ষোভ: ‘ইউনুস সরকার মানবতা বিরোধী’

টাইমস স্কয়ার ও জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্লোগান—“গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও, সংখ্যালঘুদের বাঁচাও, অবৈধ সরকার মানি না”

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার এবং জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে গত ২৫ সেপ্টেম্বর এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হলো বিশ্ব। শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি–আমেরিকান সেদিন রাস্তায় নেমে এলেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে।

তাদের দাবি—বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে দমননীতি চালানো হচ্ছে, সেটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, দেশে ফেরাতে হবে গণতন্ত্রকে। তারা ইউনুস সরকারকে অবৈধ, মানবতা বিরোধী এবং মব-অপরাধ নির্ভর সহিংস সরকার বলে অভিযোগ করেন।

টাইমস স্কয়ারে আওয়াজ তুললেন প্রবাসীরা

বিক্ষোভকারীরা “গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও,” “সংখ্যালঘুদের বাঁচাও,” “অবৈধ সরকার মানি না” ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় মিছিল করেন। আয়োজক ছিল ‘প্রো-আওয়ামী ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স’ ও ‘মাইনরিটি রাইটস ফোরাম ইউএসএ’। অংশগ্রহণকারীদের ভাষায়, শেখ হাসিনাকে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে এক অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করেছেন ইউনুস, যার পর থেকেই দেশে নেমে এসেছে নৈরাজ্য।

এক বিক্ষোভকারী বললেন, “৫ আগস্ট ২০২৪–এর পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন শুরু হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। ইউনুসকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে এবং নির্বাচন দিতে হবে।”

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও চরমপন্থার অভিযোগ

মানবাধিকার কর্মী ড. রিজওয়ানা হক সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের চলমান নির্যাতন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।” মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যেই এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকও আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট প্রস্তুত করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে একাধিক বক্তা অভিযোগ করেন, ড. ইউনুস দেশকে ধীরে ধীরে “তালেবানি রাষ্ট্রে” পরিণত করছেন। কেউ কেউ সরাসরি বলছেন, “ইউনুস বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে ঠেলে দিচ্ছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব সংখ্যালঘুরাই নির্যাতিত। এমনকি ধর্মীয় পুরোহিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা তার মুক্তি দাবি করছি।”

“অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল”

অংশগ্রহণকারীরা মনে করিয়ে দেন, শেখ হাসিনার সরকার ছিল একটি বৈধভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। এক বিক্ষোভকারী বলেন, “আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার। ৫ আগস্ট ২০২৪–এ শেখ হাসিনার সরকারকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তারপর থেকেই ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে ইউনুস বাংলাদেশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন।”

ভেতরে ইউনুসের বক্তব্য, বাইরে বিক্ষোভ

বিক্ষোভ চলার সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন ড. ইউনুস। তিনি দাবি করেন, “গত বছর আমি এখানে এসেছিলাম এক দেশ থেকে, যেখানে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। আজ আমি এসেছি বলতে, আমরা কতটা এগিয়েছি।” তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান নিয়েও কথা বলেন এবং বলেন, “বাংলাদেশি শ্রমিকরা শুধু বাংলাদেশ নয়, যেসব দেশে তারা কাজ করে সেখানেও অমূল্য অবদান রাখছে।”

তবে বাইরে দাঁড়ানো প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এসব বক্তব্য ছিল ফাঁপা। তাদের চোখে, ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে চরমপন্থার অন্ধকারে।

প্রবাসী বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—বাংলাদেশকে আবারও মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের মতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারই দেশের উন্নয়ন ও ধর্মনিরপেক্ষতার গ্যারান্টি। অথচ তাকে সরিয়ে দিয়ে ইউনুসের নামে চলছে নিপীড়ন ও ভয়ঙ্কর অরাজকতা।

টাইমস স্কয়ারে প্রবাসীদের কণ্ঠস্বর তাই শুধু একটি বিক্ষোভ নয়; এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জাগানোর ডাক।

spot_img