নড়াইলের শেষ সিনেমা হল ‘আল্পনা’ এখন তাবলিগি মসজিদ

কালিয়ার ‘আল্পনা’ সিনেমা হল পরিণত হলো তাবলিগি মারকাজে—কেউ বলছেন ধর্মীয় জাগরণ; কেউ দেখছেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র সংকোচন ও সংখ্যালঘুর সম্পত্তি মসজিদে রূপান্তরের দৃশ্য হিসেবে।

নড়াইল জেলার কালিয়ার ঐতিহ্যবাহী আল্পনা সিনেমা হল—যেখানে একসময় মানুষ ভিড় জমাতেন বাংলা ও হিন্দি সিনেমা দেখতে—এখন আর সিনেমা চলে না। ধ্বংসপ্রায় ভবনটিতে ঝুলছে নতুন ব্যানার: জায়গাটি এখন থেকে হবে তাবলিগি মারকাজ মসজিদ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাশেদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান,

“সিনেমা হলটি প্রায় ২০ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। এটি মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের অর্পিত সম্পত্তি ছিল। পরবর্তীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়া হয়েছে।”

তার মতে, দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকা ভবনটি তাবলিগ জামাতের আলমি শুরা শাখার উদ্যোগে ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

পরিবর্তন নিয়ে ভিন্নমত

স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচকভাবে। এক স্থানীয় মাওলানা বলেন, “যেখানে একসময় পাপ ও অন্ধকারের জায়গা ছিল, এখন সেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হবে, আলো ছড়াবে।”

তবে সবাই এতে একমত নন। নড়াইল জেলা সিপিব ‘র সভাপতি জিএম বারকত উল্লাহ বলেন,

“মসজিদ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে সংস্কৃতি রক্ষার জন্য এই হলটি সংরক্ষণ করা যেত। যেহেতু কাছেই একটি আধুনিক মডেল মসজিদ তৈরি হচ্ছে, তাই এ ভবনটিকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও রাখা সম্ভব ছিল।”

এছাড়া সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলেছেন। এক বাসিন্দা জানান, “তাবলিগি মারকাজ বানানোর জন্য অন্য জায়গাও ব্যবহার করা যেত। পুরোনো ভবনটি নিরাপদও নয়, ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে।”

সংস্কৃতির স্মৃতিচিহ্ন হারানো

সিনেমা হলটি মূলত ১৯৮৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম শফায়েত আলীর হাত ধরে “টাউন হল” হিসেবে উদ্বোধন হয়েছিল। পরে এটি সিনেমা হলে রূপান্তরিত হয়। আশপাশে দোকানপাট গড়ে উঠেছিল, কালের পরিক্রমায় সবকিছু ভেঙে পড়ে এবং ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে যায়।

স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক আবদুস সাত্তার আফসোস করে বলেন,

“নড়াইলে আর কোনো সিনেমা হল নেই। একসময় সদর এলাকায় ছিল ‘চিত্রবাণী’, লোহাগড়ায় ছিল ‘সন্ধ্যা’, আর কালিয়ায় ছিল ‘আল্পনা’। সবই এখন ইতিহাস।”

বাংলাদেশে একসময় এক হাজারেরও বেশি সিনেমা হল ছিল; এখন সক্রিয় হলের সংখ্যা দুই শতাধিকও নয়। বাজার সংকট, দর্শক হ্রাস এবং সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ মিলিয়ে এই পতন ঘটেছে।

অর্পিত সম্পত্তি আইনের ছায়া

এই ঘটনাটি আবার সামনে এনেছে অর্পিত সম্পত্তি আইনের বিতর্ক। পাকিস্তান আমলে চালু হওয়া “শত্রু সম্পত্তি আইন” স্বাধীনতার পরও থেকে যায় অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে। আইনটি মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০০১ সালে আইন পরিবর্তন করে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এখনো বহু সম্পত্তি ফেরত যায়নি।

আল্পনা সিনেমা হল সেই ইতিহাসেরই একটি অংশ—যেখানে সংখ্যালঘুদের মালিকানাধীন সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গিয়ে পরবর্তীতে অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

ধর্মীয় প্রভাব ও জনপরিসরের পরিবর্তন

তাবলিগ জামাতকে সাধারণত অরাজনৈতিক আন্দোলন বলা হয়। তবে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিকাঠামো বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো যেমন—সিনেমা হল, নাট্যশালা, অডিটোরিয়াম—ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে, আর সেই জায়গায় অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবণতা ইসলামী প্রভাবের উত্থানকেই প্রতিফলিত করছে, যেখানে সেক্যুলার জীবনযাত্রার ক্ষেত্র ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে।

প্রতীকী গুরুত্ব

আল্পনা সিনেমা হলের রূপান্তর কেবল একটি ভবনের পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার প্রতীক। কেউ দেখছেন এটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণ হিসেবে, আবার অনেকে বলছেন এটি ইতিহাস মুছে ফেলার নামান্তর।

স্থানীয় একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “একসময় মানুষ এখানে সিনেমা দেখে আনন্দ করত। এখন সেখানে ওয়াজ হবে। এটাই আমাদের সময়ের ছবি।”

বাংলাদেশের সমাজে সিনেমা হলের পতন এবং ধর্মীয় স্থাপনার উত্থান তাই কেবল স্থান পরিবর্তন নয়—এটি মূলত জনজীবনের চরিত্র পাল্টে যাওয়ার গল্প।

spot_img