নাসা গ্রুপের ১৬ কারখানা বন্ধ: প্রতিবাদী ৭ শ্রমিককে গ্রেপ্তার

আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শিকার হলেন ১২ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার। বেকার হওয়া হাজারো শ্রমিকের বকেয়া মজুরি আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপ–এর ১৬টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় ছড়িয়ে থাকা এসব কারখানায় প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার হঠাৎ ঘোষণার ফলে তারা রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কারখানা বন্ধের ঘোষণার পর থেকেই শ্রমিকরা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বকেয়া মজুরি ও কর্মসংস্থানের দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ জলকামান ছুঁড়ে তাদের সরিয়ে দেয়। বৃহস্পতিবার সাতজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রতিহিংসার রাজনীতি

শ্রমিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা নিছক একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়। এটি আসলে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের উপর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিহিংসামূলক দমননীতির অংশ। উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করে দমননীতি চালানোয় মিল-কারখানা বন্ধ হচ্ছে।

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি একসময় এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার অপসারণের পরপরই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয় এবং বর্তমানে তিনি দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে কারাগারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, মজুমদারকে কোণঠাসা করতেই ব্যাংকগুলো নাসা গ্রুপের জন্য এলসি (Letter of Credit) খোলা সীমিত করে দেয়। এর ফলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা বিলম্বিত করেন। নগদ অর্থ সংকটে পড়ে গ্রুপটি শ্রমিকদের বেতন দিতে ব্যর্থ হয়।

সরকারী নির্যাতনের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিল্পপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ভয়েসকে বলেছেন—

“এটি কেবল ব্যবসায়িক সংকট নয়। রাজনৈতিক কারণে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর খেসারত দিচ্ছে হাজারো শ্রমিক।”

বকেয়া মজুরি নিয়ে প্রশ্ন

ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রম মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে—আগস্ট মাসের বেতন ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এবং সেপ্টেম্বরের বেতন ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। তবে শ্রমিকরা সন্দিহান। অতীতে বারবার এমন আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তা পূর্ণ হয়নি।

শ্রমিক নেতা খায়রুল মামুন মিন্টু ভয়েসকে বলেন—

“সরকার চাইলে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে অন্তত কারখানাগুলো চালু রাখতে পারত। কিন্তু এখন তারা মালিককে টার্গেট করছে, আর শ্রমিকরা বেকার হয়ে রাস্তায় নামছে। এটা প্রতিহিংসার রাজনীতিরই ফল।”

শ্রমিকদের কান্না–ক্ষোভ

কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে দুঃস্বপ্ন। জান্নাতুল মাওয়া স্বপ্না নামে এক নারী শ্রমিক ভয়েসকে বলেন—

“আমার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নাসার কারখানায় কাজ করতাম। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, এখন খাবার জোগাড় করাও কঠিন।”

শরিফুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক বলেন—

“আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বেতন পাইনি, আবার চাকরিও নেই। অথচ এর জন্য দায়ী রাজনীতি।”

বৃহত্তর চিত্র: আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ীরা চাপে

শুধু নাসা গ্রুপ নয়—অন্তর্বর্তী সরকারের দমননীতির শিকার হচ্ছেন আরও অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তাদের প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ব্যাংকিং লেনদেনে বাধা সৃষ্টি, বিদেশি ক্রেতাদের ওপর চাপ, এমনকি মামলা দিয়ে জর্জরিত করা হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত উদ্যোক্তাদের উপর আঘাত হানা আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। এতে করে লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছে, দেশের রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়ছে।

নাসা গ্রুপের ১৬ কারখানা বন্ধ হয়ে ১২ হাজার শ্রমিক আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের দাবি, বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। কিন্তু শ্রমিকদের সংকট আসলে আরও বড় প্রশ্নের অংশ: বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দাম কাকে দিতে হবে—শ্রমিক, উদ্যোক্তা না পুরো অর্থনীতি?

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles