আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়ার বালুকাময় বন্যা সমতল থেকে পাওয়া এক জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের চোখ খুলে দিয়েছে এক নতুন শিকারি ডাইনোসরের দিকে। নাম রাখা হয়েছে হোয়াকিনর্যাপটর কাসালি। প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে, অর্থাৎ ডাইনোসরের যুগের শেষ প্রহরে এ প্রাণীটি তাণ্ডব চালাতো জলাভূমি আর নদীঘেরা ভূমিতে। আকারে বিশাল—ওজন প্রায় এক টন, দৈর্ঘ্যে ২৩ ফুট। শক্তিশালী বাহু আর ধারালো নখ দিয়ে এটি ছিল ভয়ঙ্কর শিকারি।
কঙ্কালের বিস্ময়কর সংরক্ষণ
২০১৯ সালে চুবুত প্রদেশের লাগো কলুয়ে হুয়াপি অঞ্চলে জীবাশ্মটি আবিষ্কার হয়। বিশেষত্ব হলো—এটি প্রায় সম্পূর্ণ অবস্থায় সংরক্ষিত। সাধারণত মেগার্যাপটরদের জীবাশ্ম বলতে অল্প কিছু হাড় মেলে, কিন্তু এখানে পাওয়া গেছে মাথার খুলি থেকে শুরু করে চোয়াল, মেরুদণ্ড, পাঁজর, এমনকি হাত-পায়ের হাড়ও। কার্নেগি মিউজিয়ামের প্যালিয়ন্টোলজিস্ট ম্যাট লামানা একে বলেছেন, “বিজ্ঞানে পরিচিত মেগার্যাপটরদের মধ্যে এটি সবচেয়ে সম্পূর্ণ কঙ্কালগুলোর একটি।”
শিকার করার জন্য বিশেষ দেহগঠন
মেগার্যাপটর পরিবারের বৈশিষ্ট্য হলো লম্বা হাত ও বিশাল নখর। হোয়াকিনর্যাপটরও তাই, তবে এর হাতে ছিল বিশেষ পরিবর্তন। উপরের বাহুর হাড়টি অস্বাভাবিকভাবে মোটা ও শক্ত, আর কনুইয়ের হাড়ে মাংসপেশি আঁটানোর জায়গা ছিল বড়। ফলে হাতের আঘাতের শক্তি ছিল ভয়ঙ্কর। দাঁতগুলো ছিল ছোট ও বাঁকানো, যা হাড় চূর্ণ করার জন্য নয়, বরং মাংস ছিঁড়ে ফেলার জন্য উপযোগী।
অণুবীক্ষণ যন্ত্রে হাড়ের ভেতর বার্ষিক বৃদ্ধির রেখা দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মৃত্যুকালে ডাইনোসরটির বয়স ছিল ১৯ বছর। অর্থাৎ যৌন পরিপক্ব হলেও তখনও পূর্ণাঙ্গ আকারে পৌঁছায়নি।
মুখে ধরা কুমিরের হাড়
সবচেয়ে নাটকীয় আবিষ্কার হলো এর দাঁতের ফাঁকে পাওয়া একটি কুমিরজাতীয় প্রাণীর উপরের হাতের হাড়। সেখানে হোয়াকিনর্যাপটর-এর দাঁতের ছাপ স্পষ্ট। ফলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, কুমির জাতীয় প্রাণী এদের খাদ্যতালিকায় ছিল। যদিও সেটি শিকার করা হয়েছিল নাকি মৃতদেহ থেকে ছিঁড়ে খাওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল—তা নিশ্চিত নয়। গবেষক লুসিও ইবিরিকু বলেন, “এটাই সম্ভবত প্রথম প্রমাণ, যা আমাদের বলে দিচ্ছে মেগার্যাপটররা কী খেত।”
খাদ্যশৃঙ্খলে অবস্থান
তৎকালীন দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরভাগে আবেলিসরিডরা শাসন করলেও দক্ষিণের প্যাটাগোনিয়ায় আধিপত্য ছিল মেগার্যাপটরদের। এ ভৌগোলিক বিভাজনকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘প্রভিন্সিয়ালিজম’। হোয়াকিনর্যাপটর সাধারণত তরুণ টাইটানোসর (লম্বা গলার তৃণভোজী ডাইনোসর) ও হাঁস-ঠোঁটওয়ালা হ্যাড্রোসরদের শিকার করতো। তবে কুমির জাতীয় প্রাণীর হাড় প্রমাণ করে এরা বৈচিত্র্যময় খাদ্যগ্রহণ করতো।
টিরেক্স থেকে আলাদা পথ
যদিও মেগার্যাপটররা বিবর্তনীয়ভাবে টিরানোসরের কাছাকাছি, তবে শারীরিক গঠনে দুই পরিবার একেবারেই আলাদা। টিরেক্স বিশাল মাথা, শক্ত দাঁত আর ছোট হাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অন্যদিকে হোয়াকিনর্যাপটর ছোট দাঁত, লম্বা চোয়াল আর অতি শক্তিশালী হাত দিয়ে শিকার ধরতো। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, “শীর্ষ শিকারি হওয়ার একাধিক পথ ছিল।”
গবেষণার তাৎপর্য
এই আবিষ্কার শুধু মেগার্যাপটরদের জীবনচক্র নিয়েই নয়, বরং ডাইনোসর যুগের শেষ মুহূর্তের পরিবেশগত রূপান্তর সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিয়েছে। কুমিরের হাড়সহ সংরক্ষিত এ জীবাশ্ম প্রমাণ করছে প্রাগৈতিহাসিক খাদ্যশৃঙ্খল কেমন ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তথ্য বর্তমান পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সংকট মোকাবিলাতেও সহায়ক হতে পারে।
নামের মধ্যেও রয়েছে ভালোবাসা ও সম্মান। “হোয়াকিন” রাখা হয়েছে গবেষক ইবিরিকুর ছেলের নামানুসারে, আর “কাসালি”—ভূতত্ত্ববিদ গ্যাব্রিয়েল আন্দ্রেস কাসালের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
প্যাটাগোনিয়ার এই মাটিতে লুকিয়ে থাকা জীবাশ্ম আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, ধ্বংসযজ্ঞের আগমুহূর্তেও প্রকৃতির বিবর্তন থেমে ছিল না। আর সেই গল্পই আজ আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে হোয়াকিনর্যাপটর কাসালি।

