ইরানে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোকে দমন করার নতুন এক ভয়ঙ্কর ধারা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান (সিএইচআরআই) জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১১ জন কিশোরকে ধরে নিয়ে গেছে। যাদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
কিশোরদের কেউ কেউ স্কুল থেকে, কেউবা কর্মস্থল কিংবা বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভোরের বেলা বাড়ি ঘেরাও করে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি, এমনকি কেন আটক করা হচ্ছে সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। ফলে পরিবারগুলো জানতেই পারছে না, সন্তানরা কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে।
সিএইচআরআই বলছে, এসব আটক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংস্থাটির অ্যাডভোকেসি পরিচালক বাহার গান্ধেহারি বলেন, “শিশুদের এভাবে আটক করে গোপনে কোথাও রাখা আইন প্রয়োগ নয়, এটি অপহরণ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এগুলো স্পষ্টতই ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা রাষ্ট্রীয় গুম।”
কুর্দিস্তানে ধারাবাহিক অভিযান
সবচেয়ে বেশি কিশোরকে আটক করা হয়েছে কুর্দিস্তান প্রদেশে। গত ৭ সেপ্টেম্বর কামিয়ারান শহরে ১৫ বছরের ওরাজ জামানি ও ১৬ বছরের বেহরোজ রাশিদিকে আটক করা হয়। পরে ১৭ বছরের সোরান মোজাফফারি ও পায়াম হোসেইনিকে ধরে নিয়ে যায় গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের এজেন্টরা।
এদের মধ্যে মোজাফফারি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়। কিন্তু আটক হওয়ার পর থেকে তার চিকিৎসার কোনো খোঁজ মিলছে না।
এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর কামিয়ারানে ভোর পাঁচটায় বাড়ি ঘিরে দুই ভাই—১৭ বছরের ইহসান সাবুরি ও কাভান সাবুরিকে ধরে নিয়ে যায় নিরাপত্তা বাহিনী। একইভাবে ওশনায়েভ শহরে ১৬ বছরের দিয়ার গোরগোল ও অ্যালান তাবনাককে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়।
১৯ সেপ্টেম্বর ওশনায়েভ থেকে আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের একজন ১৬ বছরের জানিয়ার শাদিখাহ।
সিস্তান-বালুচিস্তানে ভয়াবহ দমননীতি
একই ধারা দেখা গেছে সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশেও। এখানে কমপক্ষে দুই কিশোরকে আটক করেছে সাধারণ পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীরা।
৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাহেদানের একটি বেকারিতে কর্মরত ১৭ বছরের ওমর সাফারজায়ীকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর কাসর-এ-কান্দ শহর থেকে ১৭ বছরের আবদুল্লাহ আজিজিকে বাসা থেকে তুলে নেয় নিরাপত্তা বাহিনী।
অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এ দমননীতির পেছনে মূল কারণ ২০২২ সালের “ব্লাডি ফ্রাইডে” হত্যাযজ্ঞের বার্ষিকী। সেদিন জাহেদানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়ে শতাধিক মানুষ হত্যা করেছিল। এবার ওই ঘটনার তিন বছর পূর্তিতে বড় ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই শিশু ও তরুণদের ধরে নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
একজন স্থানীয় অধিকারকর্মী বলেন, “বালুচ শিশুদের বিষয়ে খবর প্রকাশ খুবই কম হয়। ফলে আসল সংখ্যাটা হয়তো অনেক বেশি। তাছাড়া আগে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক কিশোর এখনও প্রাপ্তবয়স্কদের জেলে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রয়েছে।”
শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা
ইরান বহুদিন ধরেই শিশু অধিকার লঙ্ঘনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত। দেশটি বিশ্বের কয়েকটি রাষ্ট্রের একটি, যারা এখনও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এছাড়া কিশোরদের প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে আটক রাখা, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভে শিশুদের গুলি করার মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটে আসছে।
দেশটির ফৌজদারি আইন অনুসারে মেয়েদের ক্ষেত্রে ৯ বছর বয়স থেকে এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৫ বছর বয়স থেকে অপরাধের দায় আরোপ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের স্পষ্ট বিরোধী। অথচ ইরান শিশু অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে।
সিএইচআরআই-এর মতে, এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের নানা চুক্তি ভঙ্গ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি (ICCPR), এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (CAT)।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার দাবি
সিএইচআরআই জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার, মানবাধিকার কাউন্সিল এবং বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশু আটক ও গুমের বিরুদ্ধে সরব হতে। পাশাপাশি শিশুদের অবিলম্বে মুক্তি, আটক কিশোরদের নাম-পরিচয় প্রকাশ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে এবং ইউনিসেফের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বাহার গান্ধেহারি সতর্ক করে বলেছেন, “ইরান শিশুদের গুমকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে শুধু পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত করা নয়, গোটা সংখ্যালঘু সমাজকেও দমন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল যদি নীরব থাকে, তবে এটি ভয়াবহ নজির হয়ে দাঁড়াবে।”

