২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সেনা ও ইসলামপন্থীদের সমর্থনে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষমতায় আসেন। ঘোষণা ছিল—সুশাসন ফিরবে, মানবাধিকার রক্ষা হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো। মানুষের ভরসাস্থল আদালত ও কারাগারই হয়ে উঠল আতঙ্কের প্রতীক। হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যুর মিছিল আর দমননীতির অভিযোগ আজ বাংলাদেশকে কাঁপাচ্ছে।
গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হত্যার সুস্পষ্ট ঘটনা একের পর এক ঘটলেও ইউনুস সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা অসংকোচে সত্য অস্বীকার করছেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, “৫ আগস্টের পর গত এক বছরে দেশে আর কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি, এমনকি পুলিশও একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেনি”।
শোকার্ত পরিবারের আর্তনাদ
কুমিল্লার তৌহিদুল ইসলাম ছিলেন একজ সুস্থ-সবল যুবনেতা। ৩১ জানুয়ারি ২০২৫ রাতে নিজ বাড়ি থেকে তিনি যৌথবাহিনীর হাতে আটক হন এবং পরের দিন (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) সকালে নিহত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। বড় ভাই আবুল কালাম কাঁদতে কাঁদতে ভয়েসকে বলেছেন:
“সারা রাত তাকে পেটিয়েছে। বুক, পিঠ, গলা—সব জায়গায় আঘাতের দাগ। একদিন আগেও সে সুস্থ ছিল, পরদিনই ফিরল লাশ হয়ে।”
গাইবান্ধার আবু বকর সিদ্দিক মুন্না ছিলেন ৬৮ বছরের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা। দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর জামিন পেলেও জেলগেটেই ফের নতুন মামলায় গ্রেপ্তার হন বলে অভিযোগ। তবে পুলিশ বলছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১ তারিখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। গত সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ কারাগারে তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মুন্নার ছেলে সৌমিক বলেন:
“আমার বাবা অসুস্থ ছিলেন না। তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের দেখা করার সুযোগও দেওয়া হয়নি।”
নীলফামারীর যুবলীগ নেতা মমিনুর ইসলাম ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে নীলফামারী জেলা কারাগারে হাজতিরূপে আটক ছিলেন। ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ভোর ৪টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
অভিযোগ আছে, শীতের রাতে কংক্রিটের মেঝেতে কম্বল ছাড়া ঘুমাতে বাধ্য করা হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয়। পরিবার বলছে—এটি ছিল ‘ঠাণ্ডা মাথায় মৃত্যুদণ্ড’।
মুনশিগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা সরওয়ার হোসেন নান্নু ৫ মে ২০২৫ থেকে কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৭ জুলাই ২০২৫ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ জানায় হার্ট অ্যাটাক, পরিবার দাবি করে শরীরে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন।
এসব মৃত্যুর প্রতিটি গল্পেই একটাই মিল—সরকারি ব্যাখ্যা আর পরিবারের দেখা বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
এক নজরে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ৭ ঘটনা
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ — গোপালগঞ্জে এলাহী সিকদার যৌথবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ৫ দিনের মাথায় মারা যান। শরীরে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ — গাইবান্ধার শফিকুল ইসলাম ও সোহরাব হোসেন আপেল আটক হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের রিপোর্টেও ছিল নির্যাতনের প্রমাণ।
অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৪ — বগুড়া কারাগারে এক মাসে মারা যান অন্তত চারজন আওয়ামী লীগ নেতা। সরকারি রিপোর্টে হার্ট অ্যাটাক বলা হলেও পরিবার দাবি করে নির্যাতন ও চিকিৎসা বঞ্চনার ফল।
৩১ জানুয়ারি – ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ — কুমিল্লার তৌহিদুল ইসলাম আটক হওয়ার একদিন পর লাশ ফেরত আসে। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন।
জানুয়ারি ২০২৫ — নীলফামারীর যুবলীগ নেতা মমিনুর ইসলাম শীতের রাতে কংক্রিটের মেঝেতে ঘুমাতে বাধ্য হয়ে মারা যান।
জুলাই ২০২৫ — মুনশিগঞ্জের সরওয়ার হোসেন নান্নুর মৃত্যু। একই মাসে নিহতের সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়ায়।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ — সিলেট ও মৌলভীবাজারে আরও দুইজনের মৃত্যু। পুলিশ বলছে আত্মহত্যা বা অসুস্থতা, কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে—এটি নাগরিকের নিরাপত্তার অধিকারে ভয়াবহ আঘাত।
“জাহান্নামের কষ্টে” কারাগারে
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিম বুধবার ভয়েসকে বলেছেন, “আমাদের নেতাকর্মীদের জন্য কারাগার এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। জেলের ভেতরে তাদের ওপর চালানো হচ্ছে অকথ্য নির্যাতন। খাবার অপ্রতুল, চিকিৎসা নেই, শীতের রাতে কম্বল নেই—এভাবে ধীরে ধীরে মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে।”
এ অভিযোগ মিলে যায় নিহতদের পরিবারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। মুন্নার ছেলে সৌমিক বলেন: “আমরা বাবাকে দেখতে পাইনি। পরে লাশে অসংখ্য আঘাতের দাগ পেয়েছি। এটা অসুস্থতার কারণে মৃত্যু নয়, পরিকল্পিত হত্যা।”
এক বেঁচে ফেরা আওয়ামী লীগ কর্মী (নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভয়েসকে বলেন: “আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রাতে ঠান্ডা মেঝেতে শোওয়ানো হয়। পানি চাইলে দেওয়া হয় না। অসুস্থ হলেও চিকিৎসক আনা হয় না। প্রতিদিনই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়।”
নাসিমের মতে, এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, বরং ভয় দেখিয়ে পুরো জাতিকে নীরব করে দেওয়ার কৌশল।
“এভাবে নির্যাতন চালিয়ে তারা বার্তা দিচ্ছে—কেউ আওয়াজ তুললে তার পরিণতি হবে মৃত্যু।”
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা
- আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): আগস্ট–ডিসেম্বর ২০২৪-এ মাত্র পাঁচ মাসে ১২ জনের মৃত্যু।
- ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত: নিহত ৫০ জনেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী।
- জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ (জেএমবিএফ): এক বছরে ৭০টি মৃত্যু, যার প্রায় অর্ধেক নির্যাতনের কারণে।
মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকারকর্মী তাজুল ইমাম ভয়েসকে বলেন: “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাষ্ট্রের মদদে পরিচালিত সহিংসতার অংশ। গণতন্ত্রের জন্য এটি ভয়াবহ সংকেত।”
ভরসা ভেঙে পড়ছে
পরিবারগুলো অভিযোগ করছে—তাদের মামলা নেয় না, তদন্ত চলে প্রহসনের মতো, আবার একই বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় যারা অভিযুক্ত। ফলে ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেট ও মৌলভীবাজারে নতুন মৃত্যুর ঘটনায় আসকের দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়:
“হেফাজতে মৃত্যু নাগরিকের নিরাপত্তার অধিকারকে ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রতিটি মৃত্যু মানবাধিকার লঙ্ঘন।”
তারা বলছে—সিসিটিভি নেই, স্বচ্ছ তদন্ত নেই, দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও গভীর হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বলছে—২০১৩ সালের আইন কার্যকর না হওয়াতেই আজকের ভয়াবহ বাস্তবতা।
রাজনৈতিক টার্গেট এখন আওয়ামী লীগ
যে আওয়ামী লীগকে আগে কঠোর অভিযানের অভিযোগ শুনতে হয়েছিল, আজ তারাই প্রধান ভুক্তভোগী।
- আদালত চত্বরে হামলা,
- জামিন পেলেও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার,
- চিকিৎসা ও মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা—
এসব এখন নিয়মিত দৃশ্য। আওয়ামী লীগ বলছে, এটি মূলত আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য চলমান ’গণহত্যা’ —বিরোধী কণ্ঠ নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত অভিযান।
দলটির বিবৃতিতে বলা হয়: “অবৈধ, খুনি, ফ্যাসিস্ট ইউনুস সরকারের হাতে শত শত নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই।”
নীরব কুঠুরি ভাঙার আহ্বান
আজ বাংলাদেশের জেলখানাগুলোকে পরিবারগুলো ডাকছে “নীরব কুঠুরি”—যেখান থেকে অনেকে আর জীবিত বের হন না।
এক শোকার্ত পরিবারের আর্তি: “আমরা খুনিদের কাছে বিচার চাই না। এ বিচার বাংলার মানুষের কাছে সোপর্দ করছি।”
সংস্কারের নামে আসা সরকার এখন নির্যাতনের প্রতীক। লাশের মিছিল, শোকার্ত পরিবার আর মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদ—সবই বলে দিচ্ছে: বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা দায়মুক্তির শৃঙ্খলে বন্দি।
প্রশ্ন এখন একটাই—বিশ্ব কি চুপ করে থাকবে, নাকি দাঁড়াবে ভুক্তভোগীদের পাশে, এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য?

