বন্দী অবস্থায় নির্যাতনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মৃত্যুতে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে একের পর এক রাজনৈতিক নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল (২৩ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে দলটি মানবাধিকার রক্ষায় মানুষকে সাথে নিয়ে কাজ করার অঙ্গিকার পুনরায় ব্যক্ত করেছে।

বিশেষ করে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক মুন্নার মৃত্যুকে তারা ‘‘হেফাজতে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’’ বলে অভিহিত করেছে দলটি।

আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ‘‘অবৈধ দখলদার সরকার’’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে পরিকল্পিতভাবে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে—

“অবৈধ দখলদার, খুনি, ফ্যাসিস্ট ইউনূস ও তার দোসররা একের পর এক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করছে। মুন্না চেয়ারম্যান হত্যার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, বর্তমান সরকারের আসল লক্ষ্য হলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে ধ্বংস করা।”

গুম, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ

আওয়ামী লীগ জানায়, শুধু মুন্না চেয়ারম্যান নন—দেশের বিভিন্ন জেলায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সিলেট, মৌলভীবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নেতাকর্মীদের উপর চরম নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে প্রতিনিয়ত।

দলটি দাবি করছে, বিরোধী কণ্ঠস্বর দমাতে সরকার মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে সাথে সাথেই অন্য মামলায় ‘‘শো-কজ গ্রেপ্তার’’ দেখানো হচ্ছে। এতে নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হচ্ছে।

কারাগারকে বলা হয় নিরাপদ স্থান, কিন্তু আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এখন সেটিই পরিণত হয়েছে ‘‘নরকযন্ত্রণার ঘরে’’। প্রতিদিনই বন্দিদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্ট—শেখ হাসিনার সরকার অপসারণের পরপরই—মাত্র চার দিনে অন্তত ৩১৮ জন নিহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল।

এদিকে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসেবে, ৪ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও উপাসনালয়ে হামলা, খুন ও ধর্ষণসহ অন্তত ২,০১০টি সহিংস ঘটনার শিকার হয়েছেন তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সামনেই তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ।

আওয়ামী লীগের দাবি, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের সর্বত্র পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

সংগঠিত দমন-পীড়নের কৌশল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য শুধু আওয়ামী লীগকে দমন নয়, বরং দলটির শিকড় উপড়ে ফেলা। এজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কিংবা জেলা পর্যায়ের নেতাদের ওপর বিশেষভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। কারণ তারাই জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন এবং দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্ত রাখেন।

একজন জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা মন্তব্য করেন, ‘‘এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চলছে। মুন্না চেয়ারম্যান হত্যাই তার প্রমাণ।’’

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার

আওয়ামী লীগ বলছে, বিরোধী দল ও মুক্তচিন্তার মানুষের উপর দমন-পীড়ন এখন শুধু দলীয় রাজনীতির বিষয় নয়—এটি দেশের গণতান্ত্রিক চেতনার উপর আঘাত। পরিবারগুলো যখন কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের খোঁজে অশ্রু ঝরাচ্ছে, তখন সরকার নির্বিকার।

ইউনুস সরকারের জুলুম, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবুও আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার, শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না। দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে।

‘‘আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আছি। একদিন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে,’’ দলটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ আবার এক অন্ধকার সময় অতিক্রম করছে—যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার হুমকির মুখে। কিন্তু আওয়ামী লীগ মনে করে, এদেশের মানুষ অতীতে যেমন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়েছে, এবারও তেমনি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হবে।

“বাংলাদেশ একাধিকবার স্বৈরাচারী শাসন দেখেছে। প্রতিবারই জনগণ জেগে উঠেছে। এবারও হবে তার ব্যতিক্রম নয়।”

spot_img