আশিক হত্যা মামলায় সবাই খালাস: পরিবারের ক্ষোভ, ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন

২৮ বছর পরও ন্যায়বিচার মেলেনি, ছাত্রলীগ নেতা আশিক হত্যার আসামিরা বেকসুর খালাস

চট্টগ্রামের আলোচিত ছাত্রনেতা সিনাউল হক আশিক হত্যা মামলায় দীর্ঘ ২৮ বছর পরও ন্যায়বিচার মিললো না। সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান পাঁচ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

আশিক ছিলেন সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯৭ সালের ৬ জুলাই রাতে মেহেদীবাগ এলাকায় এক বিয়ে অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় তার সহযাত্রী হাবিবও গুলিবিদ্ধ হন।

ঘটনার পর আশিকের বাবা আবুল কাশেম পঞ্চলেইশ মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন কাউন্সিলর ওমর গনি মেস কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ওসিম উদ্দিন চৌধুরী। তবে ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তিনজনের নাম মামলা থেকে বাদ পড়ে।

রায় ঘোষণা ও মামলার দীর্ঘ পথচলা

আদালতের বেন্চ সহকারী মো. শাহেদ কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সবাই খালাস পেয়েছে।’’ খালাস পাওয়া আসামিরা হলেন—টিনকু দত্ত, সালাউদ্দিন, তাসলিম উদ্দিন, শাহনেওয়াজ ও মো. হোসেন। এর মধ্যে তিনজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন, বাকি দু’জন পলাতক।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সাক্ষীর অভাব, দীর্ঘসূত্রিতা আর বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণেই এ মামলায় ন্যায়বিচার পাওয়া গেল না।

আওয়ামী লীগের ক্ষোভ

স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা রায়ের প্রতি তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই রায় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে আওয়ামী লীগের কাউকে হত্যা করলে তাদের শাস্তি হয় না, যা ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

একজন ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, “এটি কেবল একজন ছাত্রনেতার হত্যা নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া ছাত্র রাজনীতির ওপর আঘাত। ২৮ বছর পরও যদি খুনি শাস্তি না পায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি কতটা নিরাপদ?”

মানবাধিকার কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম এই রায়কে বৃহত্তর অন্যায় ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় খালাস পাওয়া একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ২০০৪ সালের আগস্টে সেনা-সমর্থিত, প্রো-ইসলামিস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আশ্চর্যজনকভাবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সব আসামিকেও সুপ্রিম কোর্ট খালাস দেয়—যেন হত্যাযজ্ঞটি কেউ চালায়নি, আকাশ থেকে অদৃশ্য আত্মারা নেমে এসেছিল। ক্ষমতা দখলের পরপরই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়, নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়—সবই বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য।”

দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিবার

আশিকের পরিবার প্রায় তিন দশক ধরে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। রায়ের পর তাদের এক আত্মীয় বলেন, “এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, রাজনৈতিক হত্যার শাস্তি পাওয়া সম্ভব নয়—এটিই যেন প্রমাণিত হলো। আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম।”

আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, এ রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক হত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় যদি ২৮ বছর পরও খালাস হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য গভীর হুমকি।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles